পাবনার সুজানগর উপজেলার আমিনপুর থানার সাগরকান্দি ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে হঠাৎ করেই জমি নিয়ে বিরোধ চরমে ওঠে। লোকমান সরদারের চাচাতো ভাই কোরবান আলী সরদার ও তার ছেলেরা দাবি করেন, হোগলাডাঙ্গি চরের ওই দেড় বিঘা জমি তাদের। অথচ নিহতের পরিবার বলছে, প্রায় ৫০ বছর ধরে ওয়ারিশ সূত্রে তারা জমিটি ভোগদখল করে আসছেন; আগে কখনও কোরবানের পূর্বপুরুষরা জমির দাবি তোলেননি।
২৪ জানুয়ারি, বেলা ১১টা। গ্রামের আকাশ তখনও শান্ত। হঠাৎ খবর আসে—কোরবান সরদার, তার ছেলে রফিকুল, শফিকুল এবং চাচাতো ভাই-ভাতিজারা দেশীয় অস্ত্র ও ভাড়া করা লোকজন নিয়ে জমিতে গেছে। পাওয়ার টিলার দিয়ে তারা দেড় বিঘা জমির জব সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়।
খবর পেয়ে লোকমান সরদার ও তার ছেলে সজিব ছুটে যান। বৃদ্ধ কৃষক হয়তো ভেবেছিলেন, কথা বলে মিটিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু কথা আর হলো না—শুরু হলো এলোপাতাড়ি মারধর। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন লোকমান। পাশে আহত ছেলেও।
স্বজনরা ছুটে এসে তাদের উদ্ধার করে প্রথমে কাশিনাথপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেন। অবস্থার অবনতি হলে নেওয়া হয় এনায়েতপুর খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকেও উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয় তাকে, Bangladesh Medical University হাসপাতালে। আইসিইউর নিঃশব্দ ঘরে কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় নিভে যায় লোকমান সরদারের জীবনপ্রদীপ।
মৃত্যুর খবর গ্রামে পৌঁছাতেই অভিযুক্তরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। তাদের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি; মুঠোফোনও বন্ধ। নিহত লোকমান সরদার ছিলেন মৃত নাছির উদ্দিন সরদারের ছেলে। তার ভাই রমজান সরদার ২৬ জানুয়ারি আমিনপুর থানায় আটজনকে আসামি করে একটি মারামারির মামলা (নম্বর ১৬) দায়ের করেন। এখন লোকমানের মৃত্যুর পর সেটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করার প্রক্রিয়া চলছে।
আমিনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুর রহমান বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আগে দায়ের হওয়া মারামারির মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর হবে। আসামিরা জামিনে থাকায় তাদের গ্রেপ্তার করা যায়নি; জামিন বাতিলের আবেদন করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভাইয়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে রমজান সরদারের কণ্ঠ ভেঙে আসে—
“আমরা ৫০ বছর ধরে জমি ভোগ দখল করে আসছি। আজ তারা সন্ত্রাসী ভাড়া করে জমি দখল করতে গিয়ে আমার ভাইকে মেরে ফেলল। আমরা দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
গোবিন্দপুরের সেই দেড় বিঘা জমিতে এখন আর জব দোল খায় না। সেখানে বাতাস বইলে গ্রামের মানুষ যেন শুনতে পায় এক বৃদ্ধ কৃষকের অপূর্ণ দীর্ঘশ্বাস—মাটি যার ছিল জীবন, সেই মাটিই হয়ে উঠল তার মৃত্যুর কারণ।

