বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন সূর্যোদয়। দীর্ঘ দুই দশকের নির্বাসন আর সংগ্রামের অবসান ঘটিয়ে আজ বঙ্গভবনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তারেক রহমান। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই বাংলাদেশে তিনি শুধু একজন প্রধানমন্ত্রী নন, বরং দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া এক বিশাল জয়ী দলের কান্ডারী। শহীদ জিয়ার আদর্শ আর বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন ছায়ায় বেড়ে ওঠা এই মানুষটি আজ নিজেই এক নতুন ইতিহাসের রূপকার।
১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর। তৎকালীন ঢাকার এক উত্তাল সময়ে জন্ম নেন জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান। তাঁর শৈশব ছিল অন্য দশটি শিশুর চেয়ে আলাদা। ১৯৭১ সালে যখন দেশ স্বাধীন হচ্ছিল, তখন মাত্র ৬ বছর বয়সে মা ও ছোট ভাই কোকোর সঙ্গে তিনি ছিলেন কারাবন্দি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তিনি ছিলেন অন্যতম কনিষ্ঠ রাজনৈতিক বন্দি।
ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পাঠ নেওয়া এই নেতার চিন্তাধারায় প্রভাব ফেলেছে সক্রেটিস, প্লেটো থেকে শুরু করে কার্ল মার্কসের দর্শন। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলীতে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে তাঁর রাজনীতির হাতেখড়ি। ১৯৯১ সালে মায়ের সঙ্গে দেশের প্রতিটি জেলায় নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে তিনি প্রথমবার দেশবাসীর নজরে আসেন।
তারেক রহমান ক্ষমতার মোহে অন্ধ ছিলেন না। তিনি জানতেন তৃণমূলই দলের শক্তি। ২০০২ সালে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হয়ে তিনি সারাদেশে ব্যালটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচন এবং তৃণমূলের সাথে সরাসরি যোগাযোগের এক আধুনিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি চালু করেন। তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত গবেষণাকেন্দ্র থেকে উঠে আসে সুশাসন আর বিকেন্দ্রীকরণের অভিনব সব পরিকল্পনা। তিনি প্রমাণ করেছিলেন—চেয়ারপার্সনের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও রাজপথের কর্মী হওয়াই তাঁর আসল পরিচয়।
২০০৭ সালের ৭ মার্চ। কোনো অভিযোগ ছাড়াই তাঁকে আটক করে তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। টানা ১৮ মাস বন্দিজীবনে তাঁর ওপর চালানো হয় অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ২০০৮ সালে মুক্তির পর তিনি লন্ডনে উন্নত চিকিৎসার জন্য যান। সুদূর লন্ডনে থেকেও গত ১৭ বছর ভার্চুয়াল সভার মাধ্যমে তিনি যুক্ত থেকেছেন প্রতিটি তৃণমূল কর্মীর সাথে। মায়ের প্রয়াণের পর শোকাতুর মনেও তিনি হোন বিএনপির চেয়ারম্যান, আর আজ হলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান কি কেবল প্রতিহিংসার রাজনীতি করবেন? না। তিনি ঘোষণা করেছেন ‘৩১ দফা’ রূপরেখা। যেখানে রয়েছে:
দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য।
প্রধানমন্ত্রীর পদের নির্দিষ্ট মেয়াদসীমা।
বেকার ভাতা ও কৃষকদের জন্য বিশেষ ‘কৃষক কার্ড’।
পরিবার কার্ড এবং ব্রিটিশ মডেলে স্বাস্থ্যসেবা।
নির্বাচন পরবর্তী প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন—জাতীয় ঐক্যই হবে তাঁর সরকারের মূল শক্তি। জামায়াতে ইসলামীর আমীর বা এনসিপির নাহিদ ইসলামের সাথে তাঁর সৌজন্য সাক্ষাৎ প্রমাণ করে যে, তিনি প্রতিহিংসা নয়, বরং জাতীয় সমঝোতায় বিশ্বাসী।
ধৈর্য, সহনশীলতা আর আধুনিক ভিশনের এক বিরল সমন্বয় আজ তারেক রহমানকে নিয়ে এসেছে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। যে মানুষটি বাসে চড়ে সাধারণ মানুষের সাথে হাত মেলাতেন, আজ তাঁর কাঁধেই ১৬ কোটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের ভার।

