ইসলামিক ক্যালেন্ডার বা হিজরি বর্ষপঞ্জির নবম মাস রমজান। সারা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে এই মাসের গুরুত্ব অপরিসীম। আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের আশায় ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকেন ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা। ইসলাম ধর্মমতে, এই মাসেই পবিত্র কোরআন নাজিল হয়েছিল এবং রমজানের রোজা ফরজ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে রোজা কবে থেকে শুরু হবে—বুধবার নাকি বৃহস্পতিবার—এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনা। কারণ সরকার বা ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। দেশে রমজান শুরুর তারিখ নির্ধারণ করা হয় জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। ইসলামী বিধান অনুসারে মুসলমানরা চন্দ্রবর্ষ অনুসরণ করেন, যেখানে প্রতিটি মাস ২৯ বা ৩০ দিনের হয় এবং নতুন চাঁদ দেখার ওপরই মাসের শুরু নির্ভর করে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ-এ জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ধর্মমন্ত্রী ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে এই কমিটি চাঁদ দেখার তথ্য পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত জানাবে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ইতোমধ্যে ‘ঢাকা জেলার সাহরি ও ইফতারের সময়সূচি’ সংক্রান্ত সম্ভাব্য একটি ক্যালেন্ডার প্রকাশ করেছে। সেই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৯ ফেব্রুয়ারি পহেলা রমজান ধরা হয়েছে। তবে তার পাশে তারকা চিহ্ন দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে—এটি চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। ফাউন্ডেশনের দ্বীনি দাওয়াত ও সংস্কৃতি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ হারুনূর রশীদ জানিয়েছেন, যদি বুধবার সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা যায়, তাহলে সেদিন থেকেই তারাবির নামাজ শুরু হবে এবং ভোরে সেহরি খেয়ে বৃহস্পতিবার প্রথম রোজা রাখা হবে। আর চাঁদ দেখা না গেলে একদিন পর রোজা শুরু হবে।
প্রকাশিত ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, প্রথম রোজার দিনে ঢাকায় ইফতারের সময় বিকেল ৫টা ৫৮ মিনিট এবং সেহরির শেষ সময় ভোর ৫টা ১২ মিনিট ধরা হয়েছে। ক্যালেন্ডারে ২০ মার্চ শুক্রবারকে ৩০তম ও শেষ রোজা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
রমজানকে সামনে রেখে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের সময়সূচিও নির্ধারণ করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গত ৮ ফেব্রুয়ারি প্রজ্ঞাপন জারি করে জানায়, হিজরি ১৪৪৭ সনের রমজান মাসে সেহরি ও ইফতারের সময় বিবেচনায় সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের অফিস চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত (রবি থেকে বৃহস্পতিবার)।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনও রমজান উপলক্ষে নতুন সময়সূচি ঘোষণা করেছে। আপিল বিভাগের অফিস চলবে সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত; দুপুরে জোহরের নামাজের জন্য বিরতি থাকবে। হাইকোর্ট বিভাগের আদালত কার্যক্রম চলবে সকাল ১০টা থেকে বিকেল সোয়া ৩টা পর্যন্ত। অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালগুলোতে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
আর্থিক খাতেও এসেছে পরিবর্তন। বাংলাদেশ ব্যাংক রমজান মাসে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করেছে। রোববার থেকে বৃহস্পতিবার অফিস চলবে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। ব্যাংকে লেনদেন হবে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত। দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ-এ লেনদেন চলবে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত। রমজান শেষে সময়সূচি আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি নিয়েও আলোচনা রয়েছে। রমজানের শুরু থেকেই মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত সেই আদেশ স্থগিত করেন। ফলে পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৫ রমজান অর্থাৎ ৭ মার্চ পর্যন্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস চলবে। ৮ মার্চ থেকে রোজার ছুটি শুরু হবে।
মাদ্রাসাগুলোতে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকেই ছুটি শুরু হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৮ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত রোজা ও ঈদসহ নির্ধারিত ছুটি রয়েছে। কলেজগুলোতে ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত ছুটি থাকবে বলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ছুটি নির্ধারণ করবে।
সব মিলিয়ে চাঁদ দেখার অপেক্ষায় রয়েছে দেশ। বুধবার সন্ধ্যার বৈঠকের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে—রমজানের প্রথম রোজা ঠিক কবে থেকে শুরু হচ্ছে।

