বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে আজ। প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় পর আবারও নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের যাত্রা শুরু হচ্ছে। সকালে জাতীয় সংসদ ভবনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথের মধ্য দিয়ে দিনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে, আর বিকেলে একই প্রাঙ্গণে শপথ নেবে নতুন সরকার।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তারেক রহমানসহ নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন। এবার বঙ্গভবনের পরিবর্তে সংসদ ভবন প্রাঙ্গণেই আয়োজন করা হয়েছে এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ছাড়াও দেশি-বিদেশি অসংখ্য অতিথির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি হয়ে উঠবে বর্ণাঢ্য।
সকালে নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদেরও শপথ গ্রহণের আয়োজন রাখা হয়েছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ ব্যবস্থাকেই সংবিধানের বিকল্প পন্থা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। কারণ চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বিদায়ী সংসদ বিলুপ্ত, স্পিকার নেই, ডেপুটি স্পিকারও কারাগারে—এমন এক ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে শপথ আয়োজন করা হচ্ছে।
নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি পেয়েছে ২০৯টি, জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছয়টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সাতটি আসনে জয়ী হয়েছেন। আদালতের নির্দেশে দুটি আসনের ফল ঘোষণা হয়নি এবং এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে একটি আসনে নির্বাচন স্থগিত ছিল। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এবারের নির্বাচন ছিল নানা নাটকীয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে। অন্তর্বর্তী সরকার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়নি। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে ওঠে বিএনপি ও তার পুরনো মিত্র জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটকে ঘিরে। নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা কাটাতে দ্রুত রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি তোলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। পরে একাধিক কমিশন গঠন, সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ‘জুলাই সনদ’ স্বাক্ষরের পর জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গেই কয়েকটি বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
প্রথমে ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলা হলেও, লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর নির্বাচনের সময় এগিয়ে এনে রোজার আগে করার বিষয়ে সমঝোতা হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নির্ধারিত তারিখেই নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে বিএনপি এককভাবে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় লাভ করে। তারেক রহমান নিজেও দুটি আসনে জয়ী হয়ে ঢাকা-১৭ আসন রেখে বগুড়া-৬ আসন ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান।
দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে অবস্থানের পর গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে সপরিবারে দেশে আসেন তিনি। ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কয়েকদিন পর আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। ২০০৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার প্রায় দুই দশক পর তার নেতৃত্বেই আবারও ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি। ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হয়ে ১৮ মাস কারাবাসের পর ২০০৮ সালে লন্ডনে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি—আজ সেই তিনিই দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে এবারই প্রথম জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দলটি এককভাবে ৬৮ এবং জোটগতভাবে ৭৭টি আসন পেয়েছে। তাদের নেতারা শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
এখন সবার নজর নতুন মন্ত্রিসভার দিকে। কেমন হবে তারেক রহমানের প্রথম মন্ত্রিসভা? কারা পাচ্ছেন স্থান? রাজনৈতিক অঙ্গনজুড়ে চলছে আলোচনা, জল্পনা-কল্পনা। তরুণ নেতাদের অংশগ্রহণ, সমমনা দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব, নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্তি—সবকিছু নিয়েই কৌতূহল তুঙ্গে। এমনকি সামাজিক মাধ্যমে সম্ভাব্য মন্ত্রীদের পক্ষে প্রচারণাও দেখা যাচ্ছে।
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি, তবে জানা গেছে—নতুন মন্ত্রিসভা ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারের তুলনায় আকারে অনেকটাই ছোট হতে পারে। বিএনপির সিনিয়র নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, জোটের শরিক ও সমমনা দলগুলোর কয়েকজন নেতাও মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন।
সব মিলিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অনিশ্চয়তা ও নাটকীয়তার পর আজ শপথের মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়—যার দিকে তাকিয়ে আছে পুরো দেশ।

