রাত তখন সাড়ে আটটা পেরিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের পরমেশ্বরদী গ্রামে দিনের কাজ শেষ করে চায়ের দোকানে বসেছিলেন দুই ভাই। বড় ভাই নাছিমুল—পেশায় রাজমিস্ত্রির ঠিকাদার। পাশে ছোট ভাই নাঈম হোসেন (২২)।
এগারো ভাই–বোনের সংসারে নাঈম ছিল সবার ছোট। শৈশবেই মা-বাবাকে হারিয়েছে। ভাইবোনদের হাত ধরেই বড় হওয়া। সংসারের অভাব ঘোচাতে বড় ভাইয়ের সঙ্গেই রাজমিস্ত্রির কাজ করত। পরিশ্রমী, চুপচাপ স্বভাবের ছেলে—এভাবেই তাকে চিনত এলাকাবাসী।
চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিতে না দিতেই নাঈমের ফোনে একটি কল আসে। সে একটু দূরে গিয়ে কথা বলতে থাকে। নাছিমুল শুনতে পান, ভাই বারবার বলছে—
“আমার কাছে টাকা নাই… আমার কাছে টাকা নাই…”
দুই-তিনবার একই কথা। কণ্ঠে ছিল চাপা উত্তেজনা।
কিছুক্ষণ পর নাছিমুল তাকিয়ে দেখেন—নাঈম আর সেখানে নেই। ভেবেছিলেন, হয়তো কোনো কাজে গেছে। তিনিও পরে বাড়ি ফিরে যান।
বাড়িতে গিয়ে ফোন করেন ছোট ভাইকে। ফোন বন্ধ।
অস্বস্তি তখনও পুরোপুরি ভর করেনি। কিন্তু আধা ঘণ্টা না যেতেই বাইরে হইচই। লোকজন দৌড়াচ্ছে খালের পাশের খোলা মাঠের দিকে—বাড়ি থেকে মাত্র ২০০ গজ দূরে।
সেখানে পড়ে আছে এক যুবকের রক্তাক্ত দেহ।
মুখ রক্তে ঢেকে গেছে—চেনা দায়।
জামাকাপড় দেখে ভাই চিনলেন—এ যে নাঈম!
দ্রুত তাকে সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসক জানান, এর আগেই সব শেষ।
নাছিমুলের কণ্ঠ কেঁপে ওঠে—
“রক্তে মুখটাই চেনা যাচ্ছিল না। এলাকার মানুষ চিনতে পারেনি। জামা দেখে বুঝেছি—ও আমার ভাই…”
সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিবুল্লাহ জানান, নিহতের শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, পেশায় রাজমিস্ত্রি হলেও নাঈম সুদের বিনিময়ে টাকা ধার দিতেন। সেই লেনদেনের বিরোধ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, অন্যদের ধরতে অভিযান চলছে।
একটি ফোনকল, কয়েকটি বাক্য—“আমার কাছে টাকা নাই”—
তারপর অন্ধকার মাঠে পড়ে থাকা এক তরুণের নিথর দেহ।
পরমেশ্বরদী গ্রামের রাত যেন এখনো সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে—টাকার হিসাব কি এতটাই ভারী হয়ে উঠেছিল, যে তার চাপে ঝরে গেল একটি তরতাজা প্রাণ?

