বাংলাদেশ থেকে গত দেড় দশকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে—এটি এখন আর কেবল রাজনৈতিক অভিযোগ নয়, বরং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যেও প্রমাণিত।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ডঃ মুহাম্মদ ইউনুস যখন পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দেন, তখন জনগণের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। তবে এই দীর্ঘ সময়ে দৃশ্যমান কোনো বিশাল অংকের টাকা ফেরত না আসায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অর্থ ফিরিয়ে আনার পথে প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
টাকা ফেরত আনা কোনো জাদুর চাবিকাঠির মতো সহজ নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। এর প্রধান বাধাগুলো হলো:
জটিল আইনি প্রক্রিয়া: পাচার হওয়া টাকা সাধারণত এমন সব দেশ বা ‘ট্যাক্স হ্যাভেন’-এ রাখা হয় যেখানে ব্যাংকিং গোপনীয়তা অত্যন্ত কঠোর। সেই দেশের আইন মেনে প্রমাণ করা যে এই টাকা অবৈধভাবে এসেছে, তা কয়েক বছরের আইনি লড়াইয়ের বিষয়।
দ্বিপাক্ষিক চুক্তি (MLAT): টাকা ফিরিয়ে আনতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের সাথে ‘Mutual Legal Assistance Treaty’ থাকতে হয়। অনেক দেশের সাথে বাংলাদেশের এই চুক্তি নেই।
তথ্যের অভাব: টাকা কোন দেশে, কার নামে এবং কোন ব্যাংকে আছে—তার সুনির্দিষ্ট তথ্য জোগাড় করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। অনেক ক্ষেত্রে এই তথ্যগুলো সরিয়ে ফেলা হয় বা ছদ্মবেশে বিনিয়োগ করা হয়।
বর্তমান অবস্থা কী?
সরকার দাবি করছে তারা হাত গুটিয়ে বসে নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার (যেমন- FBI বিশ্বব্যাংক, এবং ব্রিটিশ সরকারের সংস্থা) সাথে যোগাযোগ করছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, এই ১৬ মাসে (বা বর্তমান সময় পর্যন্ত) সরাসরি বড় কোনো অংকের নগদ টাকা দেশে ফিরে আসেনি। বরং সরকার বর্তমানে পাচার হওয়া অর্থের উৎস এবং রুটগুলো খুঁজে বের করার প্রাথমিক কাজ বা ‘পেপারওয়ার্ক’ সম্পন্ন করছে।
জনগণের প্রত্যাশা ও স্বচ্ছতা
যদি ২৮ লক্ষ কোটি টাকার কথা বলা হয়, তবে তার কতটুকু উদ্ধার হলো তা জাতিকে জানানো উচিত। সরকারের উচিত একটি ‘শ্বেতপত্র’ বা নিয়মিত বুলেটিনের মাধ্যমে জানানো যে,কত টাকা উদ্ধারের প্রক্রিয়া কতটুকু এগিয়েছে,কোন কোন দেশের সাথে আলোচনা চলছে।
আইনি জটিলতাগুলো আসলে কোথায়।
শেখ হাসিনার আমলের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, বর্তমান সরকারের কাছে জনগণের চাওয়া কেবল অভিযোগ নয়, বরং কার্যকর ফলাাফল। পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনা ডঃ ইউনুসের সরকারের জন্য একটি এসিড টেস্ট। এই টাকা ফিরে না এলে অর্থনৈতিক সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য সফল হওয়া কঠিন হবে।
পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ পর্যন্ত বেশ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ও আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যদিও নগদ টাকা সরাসরি দেশে আসা এখনো শুরু হয়নি, তবে প্রক্রিয়াটি সচল করতে যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ
পদক্ষেপের ধরণ বিস্তারিত বিবরণ
টাস্কফোর্স পুনর্গঠন পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে একটি শক্তিশালী জাতীয় টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ (BFIU), সিআইডি এবং দুদকের কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সহায়তা ব্রিটিশ সরকারের কাছে পাচার হওয়া অর্থের তথ্য চাওয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ‘ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি’ (NCA) এই অর্থ ফেরত পাঠাতে এবং আইনি সহায়তায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ এবং এফবিআই (FBI)-এর প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক হয়েছে। তারা পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত এবং ফরেনসিক তদন্তে সহায়তা করছে।
সুইস ব্যাংকের তথ্য সুইজারল্যান্ড সরকারের সাথে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। নতুন করে পাচার হওয়া অর্থের তথ্য পাওয়ার জন্য বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলোকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ইইউ দেশগুলোতে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া সন্দেহজনক বিনিয়োগ এবং স্থাবর সম্পত্তির তথ্য সংগ্রহের জন্য কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিএফআইইউ-এর তৎপরতা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) বিভিন্ন দেশে চিঠি পাঠিয়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্থগিত করার অনুরোধ জানিয়েছে।
বর্তমানে কোন পর্যায়ে আছে?
১. শনাক্তকরণ (Identification): এখন পর্যন্ত প্রধানত এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো এবং বিতর্কিত ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের বিদেশে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
২. আইনি নথি প্রস্তুত: পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনতে হলে সেদেশে মামলা করতে হয়। সরকার এখন সেই মামলার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং প্রমাণ সংগ্রহের কাজ করছে।
৩. বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর কারিগরি সহায়তা: আন্তর্জাতিক এই সংস্থাগুলো অর্থ পাচার রোধ এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার আইনি কাঠামো তৈরিতে সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছে।
কেন দেরি হচ্ছে?
সাধারণত আন্তর্জাতিক আইনে অর্থ ফেরত আনতে গড়ে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগে। ফিলিপাইন বা মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রেও বড় অংকের টাকা ফেরত আনতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হলো প্রমাণের অভাব দূর করা এবং পাচারকারীদের স্থানীয় সহযোগীদের চিহ্নিত করা।
দুবাই (সংযুক্ত আরব আমিরাত) এবং সিঙ্গাপুর—এই দুটি দেশ বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের সবচেয়ে বড় রুট হিসেবে পরিচিত। এই দেশগুলো থেকে টাকা ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল, কারণ তাদের ব্যাংকিং এবং বিনিয়োগ আইন অত্যন্ত শক্তিশালী।
নিচে দেশ দুটির ক্ষেত্রে টাকা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. দুবাই (সংযুক্ত আরব আমিরাত) থেকে টাকা ফেরত আনার প্রক্রিয়া
দুবাইয়ে সাধারণত রিয়েল এস্টেট (বাড়ি বা ফ্ল্যাট) কেনা বা গোল্ডেন ভিসার মাধ্যমে বিনিয়োগ করা হয়। এখান থেকে টাকা ফেরানো সবচেয়ে কঠিন।
আইনি চ্যালেঞ্জ: দুবাইয়ের আইন বিনিয়োগকারীদের গোপনীয়তা রক্ষা করে। সেখানে টাকাটা যে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে এসেছে, তা প্রমাণ করার দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের।
মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স (MLA): বাংলাদেশ ও আরব আমিরাতের মধ্যে অপরাধী প্রত্যর্পণ বা আইনি সহায়তার চুক্তি থাকলেও তা কার্যকর করা কঠিন। সরকারকে প্রথমে বাংলাদেশের আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে এই টাকাটি নির্দিষ্ট কোনো অপরাধের (যেমন- দুর্নীতি বা কর ফাঁকি) মাধ্যমে অর্জিত।
সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ: বাংলাদেশ সরকার যদি প্রমাণ দিতে পারে, তবে দুবাইয়ের আদালত সেই নির্দিষ্ট সম্পত্তি বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করতে পারে। এরপর দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে সেই সম্পত্তি নিলামে তুলে টাকা ফেরত আনা সম্ভব।
২. সিঙ্গাপুর থেকে টাকা ফেরত আনার প্রক্রিয়া
সিঙ্গাপুর অত্যন্ত কঠোর এবং স্বচ্ছ নিয়ম অনুসরণ করে। বিএফআইইউ (BFIU) ও দুদক: সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সরাসরি সেদেশের দুর্নীতি দমন সংস্থার (CPIB) সাথে যোগাযোগ করে।
প্রমাণ উপস্থাপন: যদি প্রমাণ করা যায় যে টাকাটি বাংলাদেশে অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত এবং অবৈধভাবে সিঙ্গাপুরে ঢুকেছে, তবে সিঙ্গাপুর সরকার দ্রুত সহযোগিতা করে।
ব্যাংকিং চ্যানেল: সিঙ্গাপুরের ব্যাংকগুলো সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য সরকারের কাছে দেয়। বাংলাদেশ সরকার সেই তথ্যের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে।
এই প্রক্রিয়ার মূল ধাপগুলো কী কী?
১. মামলা করা: প্রথমেই বাংলাদেশে ওই পাচারকারীর বিরুদ্ধে একটি অর্থ পাচার (Money Laundering) মামলা থাকতে হবে।
২. লেটার রোগাটরি (Letter Rogatory): বাংলাদেশের আদালত থেকে বিদেশের আদালতের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক অনুরোধপত্র পাঠাতে হয়।
৩. তদন্ত প্রতিবেদন: বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দেখবে যে টাকাটা তাদের দেশে এসে কোনো আইন ভঙ্গ করেছে কি না।
৪. আদালতের রায়: সবশেষে সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত যদি রায় দেয় যে টাকাটা অবৈধ, তবেই তা বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের আদেশ দেওয়া হয়।
একটি জরুরি তথ্য
২০১২ সালে সিঙ্গাপুর থেকে ২১ কোটি টাকা ফেরত আনা হয়েছিল। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি বড় উদাহরণ। বর্তমান সরকারও সেই একই পদ্ধতি ব্যবহার করে বড় অংকের টাকা ফেরানোর চেষ্টা করছে। তবে ২৮ লক্ষ কোটি টাকার মতো বিশাল অংকের ক্ষেত্রে এটি কয়েক মাসের বিষয় নয়, বরং কয়েক বছরের নিরবচ্ছিন্ন আইনি লড়াই।
আনোয়ার আলমগির

