শীতের জীর্ণতা ঝরিয়ে প্রকৃতি যখন নতুন প্রাণের স্পন্দনে জেগে ওঠে, তখন লাল পলাশের ডালে ডালে শুরু হয় এক অনন্য আয়োজন। ইট-পাথরের ধূসর সময়েও বসন্তের আকাশের নিচে আগুনরঙা পলাশগাছগুলো যেন এক একটি জীবন্ত ক্যানভাস। এই গাছগুলো কেবল ফুলই ফোটায় না, প্রতিদিন আয়োজন করে এক নীরব অথচ প্রাণবন্ত উৎসবের—যা আমাদের যান্ত্রিক জীবনে ফিরিয়ে দেয় মাটির ঘ্রাণ।
ভোরের আলো ঠিকঠাক গাছের ডালে পৌঁছানোর আগেই শুরু হয় পাখিদের আনাগোনা। পল্লির সকালগুলো এখন চড়ুইয়ের কিচিরমিচিরে মুখর। লাল পলাশফুলের কিনারায় যখন শালিক এসে বসে, তখন কালো আর লালের সেই সহাবস্থান যেন প্রকৃতির নিপুণ তুলিতে আঁকা এক শিল্পকর্ম। দূর থেকে ভেসে আসা কোকিলের ডাক মনে করিয়ে দেয়, বসন্তের আবাহন শুরু হয়ে গেছে।
পলাশের প্রতিটি ডাল এখন ব্যস্ততায় ভরপুর: চড়ুই-শালিক: কেউ ফুলে ঠোঁট ছোঁয়ায়, কেউ বা ডানা ঝাপটিয়ে এক ডাল থেকে অন্য ডালে ওড়ে। কোকিল বসন্তের সুর বেঁধে দেয় তার চিরচেনা কুহুতানে। অনেক পাখি আবার কোনো শব্দ না করে শুধু রোদে ডানা মেলে প্রকৃতির এই রূপ উপভোগ করে।
শহরের কৃত্রিম উৎসবের মতো এখানে মাইক বা আলোকসজ্জার প্রয়োজন হয় না। প্রকৃতির এই স্বাভাবিক ছন্দই প্রাণের স্পন্দন টিকিয়ে রাখে।
“প্রকৃতি কত অল্প আয়োজনেই মানুষকে আনন্দ দিতে পারে। প্রয়োজন হয় না বড় কিছুর—একটা গাছই যথেষ্ট, যদি তার চারপাশে জীবন থাকে।”
উন্নয়নের নামে যখন অকাতরে গাছ কাটা পড়ে আর কোলাহলের চাপে পাখিরা তাদের ঘর হারায়, তখন পলাশগাছে পাখির এই মেলা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। এটি কেবল একটি দৃশ্য নয়, বরং সহাবস্থান আর ধৈর্যের এক নীরব শিক্ষা।
বাতাসে শুকনো পাতার গন্ধ আর ফুলের রেণুর মাঝে পলাশগাছের নিচে দাঁড়ালে সময় যেন কিছুটা থমকে যায়। এই লাল রোদের উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতিকে সামান্য সময় দিলে, সে আমাদের ফিরিয়ে দেয় জীবনের পরম আনন্দ।

