মনির হোসেন, বেনাপোল প্রতিনিধি:
ভোরের যশোর যেন একটু বেশি সতর্ক। রাজনীতির বাতাসে ভেসে আসছে ভোটের গন্ধ, সঙ্গে সঙ্গে জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জেলায় বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা—এমনটাই বলছে পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনের হিসাব।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোরের ৬টি আসনে ৮২৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল ২৭৫টি। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০২টিতে। এর মধ্যে ৭১টি কেন্দ্রকে ধরা হয়েছে ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোরে মোট ভোটকেন্দ্র ৮২৪টি। অর্থাৎ জেলার প্রায় ৩৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ কেন্দ্রই এবার ঝুঁকির তালিকায়।
জেলা পুলিশের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ৬টি আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনে। ১২৮টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে এখানেই ঝুঁকিপূর্ণ ৯৩টি কেন্দ্র। বিপরীতে সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে-৮১টি কেন্দ্রের মধ্যে ২১টি।
আসনভিত্তিক হিসাবে যশোর-১ (শার্শা) আসনে ১০২টি কেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ৫১টি। এর মধ্যে শার্শা উপজেলায় ৬৯টির মধ্যে ৩৫টি এবং বেনাপোলে ৩৩টির মধ্যে ১৬টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।
যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে ১৭৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ৪৫টি—চৌগাছায় ২৩টি ও ঝিকরগাছায় ২২টি।
যশোর-৩ (সদর) আসনে ১৯০টির মধ্যে ৫০টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ।
যশোর-৪ (বাঘারপাড়া) আসনে ১৪৮টির মধ্যে ৪২টি—এর মধ্যে অভয়নগরে ২৭টি ও বাঘারপাড়ায় ১৫টি কেন্দ্র ঝুঁকির তালিকায়।
কেন এই ঝুঁকি? পুলিশ বলছে, উত্তরটা লুকিয়ে আছে অতীতে। আওয়ামী রেজিমের সময় জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখল, কারচুপি আর সংঘর্ষ ছিল যেন নিত্যদিনের খবর। সবশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোরের একাধিক কেন্দ্রে সংঘর্ষ হয়েছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে তো যশোর-৩ (সদর) আসনে বিএনপির প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত একাধিকবার সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। সেই সব অভিজ্ঞতা, সেই সব রক্তাক্ত স্মৃতি—সব মিলিয়েই এবার আগেভাগে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিত করেছে পুলিশ।
জেলা পুলিশের ভাষায়, সীমান্ত এলাকা, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চল, প্রভাবশালী ব্যক্তির বাড়ির পাশের কেন্দ্র এবং অতীতে যেখানে ঝামেলা হয়েছে—সেসব কেন্দ্রই মূলত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। এর বাইরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ‘ঝামেলা হতে পারে’—এমন সম্ভাব্য কেন্দ্রগুলোও নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আবুল বাশার জানালেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সব ধরনের নিরাপত্তা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে থাকবে সিসি ক্যামেরা। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে থাকবে অনলাইন সিসি ক্যামেরা, যা সার্বক্ষণিক মনিটর করা হবে। এসব কেন্দ্রে থাকবে কমপক্ষে দুটি বডি ক্যামেরা, অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স, পাশাপাশি সেনাবাহিনী, র্যাব ও বিজিবির বাড়তি সদস্য।
তিনি আরও জানান, যেখানে সাধারণত চারটি কেন্দ্রের জন্য একটি মোবাইল টিম থাকে, সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ দুটি কেন্দ্রের জন্য থাকবে একটি মোবাইল টিম। নির্বাচনের আগেই এসব এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনে বাধা দিতে পারে—এমন সন্ত্রাসীদের তালিকা করে যৌথবাহিনীর অভিযানও শুরু হয়েছে, যা ভোটের আগ পর্যন্ত চলবে।
এদিকে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নিচ্ছে। যশোর জেলা জামায়াতের প্রচার সেক্রেটারি অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন বিশ্বাস জানান, ভোটকেন্দ্রে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে চাইলে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে তা প্রতিরোধ করা হবে।
আর যশোর-৩ (সদর) আসনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও জেলা যুবদলের আহ্বায়ক আনছারুল হক রানা বলছেন, দীর্ঘ আন্দোলনের পর মানুষ একটি সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। কেউ যদি ভোট বানচালের চেষ্টা করে, বিএনপি সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে তা প্রতিহত করবে।
পুলিশের ভাষায়, মণিরামপুর যশোর জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা। প্রত্যন্ত এলাকায় দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পৌঁছানো কঠিন—এই বাস্তবতাই যশোর-৫ আসনে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়িয়েছে।
ভোটের দিন কোনো অনিয়ম বা সংঘাতের খবর পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও অনিয়মের তথ্য নিকটস্থ ফাঁড়ি, ক্যাম্প বা পুলিশ কন্ট্রোল রুমে জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
যশোরের আকাশে তাই এখন শুধু নির্বাচনী পোস্টার নয়—ভাসছে সতর্কতার ছায়াও।

