আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রতি রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের আস্থার সংকট প্রকট হচ্ছে। নির্বাচনের দোরগোড়ায় এসে বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন, আচরণবিধি সংশোধন এবং আদালতের আদেশে তফসিল পুনর্বিন্যাসসহ নানা জটিলতায় প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে কমিশনের সক্ষমতা। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের যে আকাঙ্ক্ষা জনমনে তৈরি হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অভিজ্ঞতার ঘাটতি ও দ্বৈত ভোটের চ্যালেঞ্জ: সার্চ কমিটির মাধ্যমে ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর দায়িত্ব নেওয়া বর্তমান কমিশনের এটাই প্রথম বড় পরীক্ষা। ইতিপূর্বে কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচন বা উপনির্বাচন না করেই সরাসরি জাতীয় নির্বাচনে নামছে তারা। একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের মতো বিশাল কর্মযজ্ঞ সামলানোর মতো বাস্তব অভিজ্ঞতা কমিশনের নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কেবল একটি কেন্দ্রে ৫০০ ভোটারের ‘মক ভোটিং’ অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে এই বড় চ্যালেঞ্জ নেওয়া হয়েছে। যদিও কমিশনের দাবি, ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এই সংকট উত্তরণে সহায়ক হবে।
বিতর্কিত নির্দেশনা ও গণভোট: গণভোটে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষে-বিপক্ষে প্রচার না করার নির্দেশনা নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইসি জানিয়েছে, কর্মকর্তারা প্রচার চালাতে না পারলেও জনসচেতনতা তৈরি করতে পারবেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা চলমান থাকায় কমিশনের এই অবস্থান ভোটারদের কাছে ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
আচরণবিধি ও আইনের মারপ্যাঁচে ইসি: তফসিল ঘোষণার পর থেকেই ইসি নানা সংশোধনী আনতে বাধ্য হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো:
প্রার্থিতা নিয়ে ‘অনুগ্রহ’: জিরো টলারেন্স নীতি থাকলেও ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতা বৈধ করার অভিযোগ উঠেছে। এনসিপিসহ বিভিন্ন দল অভিযোগ করেছে যে, বিএনপি ও জামায়াতের চাপে কমিশন এই নমনীয়তা দেখিয়েছে।
পোস্টাল ব্যালট: ব্যালটে প্রতীকের অবস্থান নিয়ে বিতর্কের জেরে শেষ মুহূর্তে বিধিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
আচরণবিধি শিথিল: রাজনৈতিক দলগুলোর চাপে নির্বাচনের মাঝপথে মাইক ব্যবহারের সীমা তোলা এবং ডিজিটাল ব্যানারের সুযোগ বাড়িয়ে বিধিমালা সংশোধন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত: নির্বাচন বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন কমিশনের দুর্বলতাকেই ফুটিয়ে তুলছে। অন্যদিকে বিশ্লেষক মনিরা হকের মতে, দলীয় সরকার না থাকলেও ইসির আচরণে রাজনৈতিক চাপের ছাপ স্পষ্ট। তবে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ সব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, তারা ইনসাফের সঙ্গে কাজ করছেন এবং কোনো রাজনৈতিক চাপ নেই।
আদালতের নির্দেশনা: এদিকে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বন্ধের দাবিতে করা একটি রিট সম্প্রতি খারিজ করে দিয়েছে হাইকোর্ট। রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, নির্বাচন স্থগিতের উদ্দেশ্যমূলক প্রার্থনা থাকায় আদালত তা গ্রহণ করেনি।

