সুলতান মাহমুদ, দিনাজপুর
দিনাজপুর সদরের নশিপুর সাতমাইল এলাকার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এ বছর টমেটোর বাম্পার ফলন কৃষকদের মুখে ফিরিয়ে এনেছে স্বস্তির হাসি। সারি সারি সবুজ গাছের ডালে থোকা থোকা লাল টমেটো ঝুলে আছে—দূর থেকে দেখলেই বোঝা যায় ফলনের প্রাচুর্য।
মাঠজুড়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে ব্যস্ততা। কেউ টমেটো তুলছেন, কেউ বাছাই করছেন, আবার কেউ বাঁশ, জাংলি ও নাইলন সুতা দিয়ে মাচা বাঁধছেন। ভালো ফলন আর বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় এ এলাকার টমেটো চাষিরা এবার বেশ আশাবাদী।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া টমেটো চাষের জন্য বেশ অনুকূলে ছিল। সময়মতো বৃষ্টি ও শীতের তীব্রতা কম থাকায় গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়েছে এবং রোগবালাইয়ের প্রকোপও তুলনামূলক কম দেখা গেছে। ফলে উৎপাদন খরচের তুলনায় ফলন অনেক বেশি হয়েছে। এর সুফল পাচ্ছেন মাঠের চাষিরা।
নসিপুর গ্রামের কৃষক একলাছুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ৩৩ শতক জমিতে ‘বিউটিফুল প্লাস’ ও ‘বিউটিফুল টু’ জাতের টমেটোর আবাদ করেছেন। জমি প্রস্তুত, উন্নত জাতের চারা, সার, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ মিলিয়ে তার মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা। তবে উৎপাদন শুরু হওয়ার এক মাসের মধ্যেই জমি থেকেই তিনি প্রায় ৮০ হাজার টাকার টমেটো বিক্রি করেছেন।
তিনি আরও জানান, আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টমেটো তোলা ও বিক্রি চলবে। সব খরচ বাদ দিয়ে এক বিঘা জমিতে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ হবে বলে তিনি আশা করছেন।
এলাকার অন্যান্য চাষিরাও একই অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছেন। তাদের মতে, বর্তমানে জমি থেকেই প্রতি কেজি টমেটো ৫৫ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতে ৬৫ থেকে ৬৭ টাকা কেজি দরেও টমেটো বিক্রি হয়েছে।
প্রতি সপ্তাহে দুইবার করে টমেটো তুলতে হচ্ছে, যা ফলনের ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে। প্রতিটি গাছে গড়ে চার থেকে সাত কেজি পর্যন্ত টমেটো ধরেছে বলে জানান চাষিরা। অতিরিক্ত ফলনের কারণে অনেক কৃষক মাচা তৈরি করে গাছ ঝুলিয়ে রাখছেন, এতে ফলন ভালো থাকে এবং রোগবালাইও তুলনামূলক কম হয়।
একই এলাকার কৃষক মহিদুল ইসলাম বলেন, এ বছর আলু, বেগুন, ফুলকপি বাঁধাকপিসহ অনেক সবজিতে আমরা কাঙ্ক্ষিত দাম পাইনি। কিন্তু টমেটো চাষ করে ভালো দাম পাচ্ছি। অন্য ফসলে যে লোকসান হয়েছে, টমেটো সেটার অনেকটাই পুষিয়ে দিচ্ছে। তার মতে, টমেটোই এখন এই মৌসুমে কৃষকদের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে।
আরেক কৃষক মতিউর রহমান জানান, তার জমিতে টমেটো ধরা শুরু হয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকে বড় পরিসরে বাজারজাত করতে পারবেন বলে তিনি আশা করছেন। তিনি বলেন, আবহাওয়া যদি অনুকূলে থাকে এবং বড় কোনো রোগ না আসে, তাহলে এবার টমেটোই আমাদের সবচেয়ে লাভজনক ফসল হবে।
কৃষক সাইদুল হক বলেন, টমেটো এখন শীতকালীন সবজির মধ্যে সবচেয়ে লাভজনক ফসল। ৩০ টাকা কেজি দাম পেলেও আমাদের লাভ থাকত। আর এখন তো ৫০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এমন দাম খুব কম মৌসুমেই পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে দিনাজপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাসুদ তুষার বলেন, এ বছর টমেটো চাষ কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, রোগবালাই দমন ও আধুনিক চাষপদ্ধতি বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

