অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে ছিলেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, সিলেট মহানগর-এর সভাপতি অ্যাডভোকেট মৃত্যুঞ্জয় ধর, পূজা উদযাপন পরিষদ, সিলেট মহানগর-এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট মলয় পুরকায়স্থ, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান, সিলেট জেলা-এর সভাপতি অ্যাডভোকেট বিজয় কৃষ্ণ বিশ্বাস, ডেইলি স্টার-এর সিলেট প্রতিনিধি মিন্টু দেশোয়ারা, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর ব্যুরো চিফ ইকবাল সিদ্দিকী, খাসি সোশ্যাল কাউন্সিল-এর সেক্রেটারি অনিলজয় ডিকার, খাসিয়া নারী প্রতিনিধি হিলদা মুকিম, সিলেট জেলা কর আইনজীবী সমিতির সভাপতি সমর বিজয় সী শেখর, আইনজীবী রনেন সরকার রনি, পাত্র সম্প্রদায় কল্যাণ পরিষদের সভাপতি গৌরাঙ্গ পাত্র, এথনিক কমিউনিটি ডেভেলাপমেন্ট অর্গানাইজেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লক্ষীকান্ত সিংহ, চা শ্রমিক নেতা হরি সবর, চা শ্রমিক নেত্রী শেলী দাস, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক জহিরুল হক শাকিল, সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলন, সিলেট-এর সমন্বয়ক আব্দুল করিম কিম, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রণব কান্তি দেব, সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এড. এমাদউল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহীন, ওঁরাও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি মিলন ওঁরাও, শাবিপ্রবি-এর পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক নাজিয়া চৌধুরী, সচেতন নাগরিক কমিটি, সিলেট-এর সভাপতি এড. সৈয়দা শিরিন হক, প্রেসবেট্রিয়ান চার্চ-এর চেয়ারম্যান ডিকন নিঝুম সাংমা, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্ট-এর সদস্য সচিব রাজিব কুমার দে, বাংলাদেশ বৌদ্ধ যুব পরিষদ (সিলেট অঞ্চল)-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি উৎফল বড়ুয়া,হিজড়া যুব কল্যাণ সংস্থা, সিলেট-এর সভাপতি মিস সুকতা, হিজড়া যুব কল্যাণ সংস্থা, সিলেট-এর কোষাধ্যক্ষ মুক্তি, বাংলাদেশ দলিত পরিষদ, সিলেট বিভাগের সভাপতি মিলন রবিদাস, বৌদ্ধ সমিতি, সিলেট-এর সভাপতি চন্দ্র শেখর বড়ুয়া,সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শামসুল বাসিত শেরো, উদ্যোক্তা পীযূষ কান্তি পুরকায়স্থ এবং সিজিএস-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান প্রমুখ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ যখন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণকে গণতন্ত্রের একটি মূল মানদণ্ড হিসেবে দেখতে হবে, কোনো পার্শ্ব ইস্যু হিসেবে নয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯.৬ শতাংশ হলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা মনে করেন, রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও কর্মসূচিতে তাদের বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্ব পায় না। নির্বাচনের সময় অনেক দল তাদেরকে ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করলেও নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান ও দায়িত্বশীল উদ্যোগ কম দেখা যায়। এই সংকট শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি কাঠামোগতও। সংখ্যালঘু নাগরিকদের অনেকেই দৈনন্দিন জীবনেই অনিশ্চয়তা, বৈষম্য এবং নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, আর নির্বাচনের সময় এসব ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন শুধু ভোট দেওয়ার সুযোগ নয়; বরং ভয়মুক্ত পরিবেশে, কোনো চাপ বা হুমকি ছাড়া রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়ও। সেটি নিশ্চিত না হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র কেবল কথার পর্যায়ে থেকে যায়। আদিবাসী সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এই চ্যালেঞ্জ আরও দীর্ঘদিনের। সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, ভাষা ও পরিচয়ের স্বীকৃতি, ভূমি- সম্পত্তি সংক্রান্ত সংকট এবং ন্যায্য অধিকার বাস্তবায়নের বিষয়গুলো এখনও অনেকাংশে অসমাধান রয়ে গেছে। শুধু স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়, বাস্তবায়নই অধিকারকে অর্থবহ করে তোলে।
এই বাস্তবায়ন না থাকলে আদিবাসীসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত থাকে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও সংগঠনগুলো বারবার কয়েকটি জরুরি দাবি তুলে ধরেছে—কার্যকর সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন, সংখ্যালঘু বিষয়ক সাংবিধানিক ব্যবস্থা (কমিশন বা মন্ত্রণালয়), বিদ্যমান প্রতিনিধিত্ব ও প্রশ্নর বাস্তবায়ন এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। কিন্তু বাস্তবে এসব দাবির অগ্রগতি এখনও খুব সীমিত, যা দীর্ঘদিনের হতাশা ও অনাস্থাকে আরও গভীর করেছে। বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রতীকি বক্তৃতার বাইরে গিয়ে বাস্তবসম্মত ও পরিমাপযোগ্য অঙ্গীকার করতে হবে। নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি করা, দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এবং বৈষম্য কমাতে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কার গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই প্রশ্নের ওপর—সব নাগরিক কি সমানভাবে নিরাপদ, সমানভাবে মূল্যবান এবং সমানভাবে প্রতিনিধিত্বশীল বোধ করছেন কি না।
“Counting Every Voice” মানে শুধু ভোটের দিন উপস্থিত থাকা নয়; এটি এমন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে সংখ্যালঘু নাগরিকরা ভয় ছাড়াই অংশ নিতে পারবেন, মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারবেন এবং দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় পূর্ণাঙ্গভাবে নিজেদের জায়গা অনুভব করবেন।
কেন কিছু জনগোষ্ঠীকে বারবার “সংখ্যালঘু” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়—যেন তারা জাতির মূলধারার বাইরে—এ প্রশ্ন তোলা জরুরি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য এবং তাদের আত্মত্যাগ ও অংশগ্রহণ অনস্বীকার্য। জাতি গঠনের ইতিহাসে তাদের ভূমিকা কখনোই প্রান্তিক করে দেখা উচিত নয়। কিন্তু এই যৌথ ইতিহাস সত্ত্বেও নির্বাচন-পূর্ব সময় থেকেই তারা সহিংসতা ও ভয়ভীতির শিকার হচ্ছে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, যদি নির্বাচনের আগেই এমন হামলা ঘটে, তাহলে নির্বাচনের পর রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও কতটা খারাপ হতে পারে, তা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তাই সকল নাগরিকের নিরাপত্তা, বিচার এবং সমান মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা এখন আরও তীব্রভাবে সামনে এসেছে।
আমরা ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মহাসমাবেশে ৮ দফা দাবি উপস্থাপন করেছিলাম, কিন্তু আজও তা পূরণ হয়নি। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর আমরা আশা করেছিলাম—হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান, খ্রিস্টান সবাই একসাথে কাজ করব। কিন্তু সেই আশা আজও পূরণ হয়নি। বাংলাদেশে নির্বাচন এলেই আমরা সংখ্যালঘুরা ভয় ও আতঙ্কে থাকি। স্থানীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে হিন্দু ও বৌদ্ধদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। দীপু চন্দ্র দাস, মুনির চক্রবর্তী, রানা প্রসাদ বৈরাগীসহ আরও অনেককে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, যে রাজনৈতিক দল সরকারে যায়, তারা নিজেদের মতো করে আইন তৈরি করে।
যারা আইন প্রণয়ন করেন, অনেক সময় তারা নিজেরাই বোঝেন না—তারা কী করছেন। দেশে মবের প্রবণতা শুরু হয়েছে। মব কখনো বিচার হতে পারে না। এই মবের মাধ্যমে আমাদের ওপর জুলুম ও নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রশাসনের কাছে সমাধান চাইতে গেলে তারা বলে, ‘দেখছি’, কিন্তু কোনো সমাধান করে না। তাহলে আমরা কার কাছে যাব? কাকে বিশ্বাস করব? তিনি আরও বলেন, এই দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রবল। এই ভূখণ্ডে জন্মেছি—এটাই যেন আমাদের ‘পাপ’হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, “আসন্ন নির্বাচনে এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলকে সংখ্যালঘুদের বিষয়ে স্পষ্টভাবে কথা বলতে দেখলাম না। যোগ্যতার ভিত্তিতে সংখ্যালঘুদের নির্বাচনে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। সংখ্যালঘুদের ভূমি অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। আমরা একটি বিশ্বাসযোগ্য রাষ্ট্র, বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক দল এবং বিশ্বাসযোগ্য ভালো মানুষ চাই ।

