সুলতান মাহমুদ, দিনাজপুর
দিনাজপুর পার্বতীপুরের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন চোখে পড়ছে ভিন্ন রঙের ফুলকপি। সাদা নয়, বরং বেগুনি, হালকা সবুজ ও রঙিন আভায় ভরা এসব ফুলকপি চাষ করে লাভের মুখ দেখছেন এলাকার কৃষকরা।
স্বল্প সময়ে ভালো ফলন, বাজারে চাহিদা এবং তুলনামূলক বেশি দাম পাওয়ায় দিন দিন রঙিন ফুলকপির চাষে আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে পার্বতীপুর উপজেলার চন্ডিপুর ইউনিয়নের মেরিয়া গ্রাম এখন রঙিন ফুলকপির জন্য আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে পার্বতীপুর উপজেলায় প্রায় ৪ হেক্টর জমিতে রঙিন ফুলকপির চাষ হয়েছে। গত নভেম্বর মাসের প্রথম দিকে এসব জমিতে চারা রোপণ করা হয়। বর্তমানে প্রতিটি ফুলকপির ওজন গড়ে সাড়ে ৭০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি পর্যন্ত হচ্ছে। প্রতি একর জমিতে চাষ করতে খরচ পড়েছে আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু বাজারে দাম ভালো থাকায় কৃষকরা খরচ তুলে নিয়ে উল্লেখযোগ্য লাভের আশা করছেন।
চাষিরা জানান, জমি থেকেই রঙিন ফুলকপি প্রতি কেজি ২৫ থেকে ২৮ টাকায় বিক্রি করছেন তারা। পাইকাররা সেই ফুলকপি স্থানীয় ও আঞ্চলিক বাজারে নিয়ে গিয়ে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। অন্য জাতের ফুলকপির তুলনায় রঙিন ফুলকপির দাম বেশি হওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ী—উভয়ই লাভবান হচ্ছেন। পাশাপাশি পুষ্টিগুণ বেশি হওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যেও রঙিন ফুলকপির চাহিদা বাড়ছে।
মেরিয়া গ্রামের কৃষক মোজাহার হোসেন রঙিন ফুলকপি চাষে সফলতার উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি জানান, গত বছর পরীক্ষামূলকভাবে মাত্র ২০ শতক জমিতে রঙিন ফুলকপি চাষ করেছিলেন। ফলন ও দাম ভালো পাওয়ায় চলতি মৌসুমে তিনি এ বছর ২ একর জমিতে এই জাতের ফুলকপি চাষ করেছেন। এতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। তবে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী তিনি ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন।
মোজাহার হোসেন বলেন, “কৃষি বিভাগের পরামর্শে আমি সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে রঙিন ফুলকপি চাষ করেছি। ফেরোমন ফাঁদ ও আলোক ফাঁদ ব্যবহার করে পোকামাকড় দমন করেছি, রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়েছি। শুরুতে কিছুটা ঝুঁকি ছিল, কিন্তু ফলন দেখে এখন আমি খুবই আশাবাদী। আমার স্ত্রীও আমাকে উৎসাহ দিয়েছে। আগামী বছর আরও বেশি জমিতে এই রঙিন ফুলকপি চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
একই গ্রামের এন্তাজুল ইসলাম জানান, রঙিন ফুলকপির চারা উৎপাদন ও সরবরাহ করে লাভবান হয়েছেন। তিনি বলেন, আমি কৃষি বিভাগের মাধ্যমে বীজ সংগ্রহ করে নিজের খামারে চারা উৎপাদন করি। ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যেই এসব চারা চাষিদের কাছে সরবরাহ করেছি। চারা বিক্রি করেও লাভ হয়েছে, পাশাপাশি নিজের জমিতেও রঙিন ফুলকপি চাষ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে, বাজারে চাহিদাও বেশ। তাই ভবিষ্যতে এই চাষ আরও বাড়াব।
স্থানীয় কৃষক আজাহার আলী ও খাদেমুল ইসলাম জানান, রঙিন ফুলকপির বাজার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। তারা বলেন, একই পরিশ্রম, একই সার ও সেচ ব্যবস্থায় যদি বেশি দামের সবজি উৎপাদন করা যায়, তাহলে কৃষকরা কেন আগ্রহী হবে না? গত বছরের তুলনায় এ বছর আমাদের এলাকায় রঙিন ফুলকপির আবাদ অনেক বেড়েছে। শীতকালীন এই সবজি চাষে কৃষকদের আগ্রহ আরও বাড়বে।
পার্বতীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজীব হুসাইন বলেন, পার্বতীপুরের উর্বর জমিতে শীতকালীন সবজি চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এ বছর রঙিন ফুলকপির ফলন ও বাজারমূল্য দুটোই ভালো হয়েছে। কৃষি বিভাগ থেকে আমরা চাষিদের প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত পরামর্শ দিয়েছি। মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা সার, সেচ ও পরিচর্যার বিষয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন। এর ফলেই রঙিন ফুলকপির চাষ সম্প্রসারিত হচ্ছে।
দিনাজপুর কৃষি প্রকল্প কর্মকর্তা আবু রেজা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, সরকারের কৃষি উন্নয়ন ও টেকসই প্রকল্পের আওতায় রঙিন ফুলকপি চাষকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে চাষিদের বীজ, সার ও প্রশিক্ষণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। দিনাজপুর জেলার ১৩টি উপজেলায় রঙিন ফুলকপির চাষ বাড়ছে। বাজারে চাহিদা ও ভালো দাম থাকায় আগামী মৌসুমে চাষ আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আমরা আশাবাদী।

