সৈকত রায়হান শাওন,
এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশ আজ এক নীরব পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে যার নাম প্লাস্টিক দূষণ। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা দিন দিন পরিণত হচ্ছে প্লাস্টিক বর্জ্যের এক বিশাল স্তূপে। প্রতিদিন নগরীতে উৎপন্ন হচ্ছে শত শত টন প্লাস্টিক বর্জ্য, যার বড় একটি অংশ সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে রাস্তাঘাট, নালা-নর্দমা, খাল ও নদীতে জমে থাকছে। এর ফলে একদিকে যেমন নগরজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে, অন্যদিকে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর পড়ছে ভয়াবহ প্রভাব।
রাজধানী ঢাকার চিত্রটি আজ সারা দেশের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও প্লাস্টিক দূষণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। হাটবাজারে একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন, খাবারের মোড়ক ও প্লাস্টিক বোতল ব্যবহারের পর যত্রতত্র ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এসব প্লাস্টিক মাটিতে মিশে মাইক্রোপ্লাস্টিকে রূপ নিচ্ছে, যা জমির উর্বরতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে নদী ও জলাশয়ে জমে থাকা প্লাস্টিক মাছের প্রজনন ব্যাহত করছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। ঢাকা বর্তমানে শুধু মানুষের শহর নয়, প্লাস্টিক বর্জ্যের অন্যতম বৃহৎ আখড়ায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন রাজধানীতে প্রায় ৬০০ টনেরও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য সৃষ্টি হয় যার অর্ধেকই অব্যবস্থাপনার কারণে রাস্তায়, নর্দমায়, খালে ও নদীতে জমে থাকে।
শহরের যে কোনো মোড়ে তাকালেই দেখা যায় দোকানের সামনে ছেঁড়া পলিথিন, পানির বোতল, জুসের মোড়ক, খাবারের প্লেট ও স্ট্র ছড়িয়ে আছে। বাসে, ফুটপাথে, চায়ের দোকানে বা অফিসের সামনে ঢাকার প্রতিটি কোণে প্লাস্টিকের উপস্থিতি এতটাই প্রকট যে শহরটি যেন এক অদৃশ্য প্লাস্টিকের স্তরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ব্যবহারের পর এই প্লাস্টিক কোথায় যায়, তা কীভাবে পরিবেশে মিশে মারাত্মক ক্ষতি করে সে বিষয়ে আমাদের সচেতনতা প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে প্লাস্টিক জমে ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে; সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীর রাস্তায় হাঁটা-চলা দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। নাগরিক ভোগান্তি বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশগত ক্ষতি হয় বহুগুণে।
তবে এই সংকট শুধুই ঢাকার নয়; বরং বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, শহর, পৌরসভা ও গ্রামের হাট-বাজার পর্যন্ত এখন প্লাস্টিক দূষণে আক্রান্ত। শহর থেকে গ্রামে প্লাস্টিকের বিস্তার ঠিক এমনভাবে ঘটেছে, যেন এটি একটি নীরব মহামারি। গ্রামীণ হাটে প্রতিটি কেনাকাটায় নতুন পলিথিন দেওয়া হয়, যা ব্যবহারের পরই আশপাশে ফেলে দেওয়া হয়। ধানক্ষেত, পুকুরের ঘাট, খাল-বিল বা বাজারের পাশ সবখানেই এখন প্লাস্টিকের স্তর জমে থাকে। মাটিতে জমে থাকা এই প্লাস্টিক ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিকে রূপ নেয়, যা মাটির উর্বরতা নষ্ট করে। কৃষকের জমিতে সারের কার্যকারিতা কমে যায়, ফলে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। অন্যদিকে নদী ও জলাশয়ে জমে থাকা প্লাস্টিক পানির প্রবাহ ব্যাহত করে, ফলে পানি স্থির হয়ে দূষণ বাড়ে এবং মাছের প্রজনন ব্যাহত হয়। অনেক মাছের পেটে প্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে, যা সরাসরি খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে মানুষের শরীরে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়বে খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন, জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের ওপর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে বছরে যে প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয় তার ৫৫–৬০ শতাংশ এখনো পুনর্ব্যবহারযোগ্য পদ্ধতির আওতায় আনা যায় না। কারণ দেশের প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাই ও রিসাইক্লিং সেক্টর এখনো সুসংগঠিত নয়। সবচেয়ে ভয়াবহ সমস্যা হলো একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, যেমন: পলিথিন ব্যাগ, প্লাস্টিক কাপ, স্ট্র, চিপসের মোড়ক, অনলাইন প্যাকেজিং ইত্যাদি। এ ধরনের প্লাস্টিক শত শত বছরেও নষ্ট হয় না। আমরা আজ যে পলিথিনটি বাজার থেকে নিয়ে এসে আবর্জনার ঝুড়িতে ফেলে দিচ্ছি, তা আগামী সাত থেকে আট প্রজন্ম পরেও পরিবেশে টিকে থাকবে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ু, লবণ, পানীয় পানি এবং এমনকি মানুষের রক্তেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে। বছরে একজন মানুষ অজান্তেই প্রায় ৫০,০০০ মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছে যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, হরমোনজনিত সমস্যা, ক্যানসারসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্লাস্টিক দূষণ রোধে সরকার ২০০২ সালেই পাতলা পলিথিন নিষিদ্ধ করেছিল কিন্তু বাস্তবায়নে ঘাটতি এখনও প্রকট। নির্বিচারে পলিথিন উৎপাদন, নিয়ন্ত্রণের অভাব, ব্যবসায়ীদের মুনাফাকেন্দ্রিকতা এবং নাগরিক সচেতনতার অভাব মিলেই এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। শহর ও গ্রামে ময়লা সংগ্রহের সঠিক ব্যবস্থা নেই; আলাদা করে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ বা রিসাইক্লিংয়ের বাধ্যবাধকতা নেই। বাস্তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বড় অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক খাতে নির্ভরশীল যেখানে রিসাইক্লিংয়ের সক্ষমতা সীমিত। ফলে অধিকাংশ প্লাস্টিক পরিবেশের বুকেই জমে থেকে বিষ ঢালছে।
এই সংকট মোকাবিলায় সমাধান দরকার তিনস্তরীয় সরকারি উদ্যোগ, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলতা এবং নাগরিক আচরণ পরিবর্তন। সরকার চাইলে কার্যকর নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ, রিসাইক্লিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, বায়োডিগ্রেডেবল বিকল্প পণ্য উৎসাহিত করা এবং উৎপাদকদের বাধ্যবাধকতা বাড়িয়ে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে দিতে পারে। ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলো প্যাকেজিংয়ে প্লাস্টিক কমিয়ে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা বায়োডিগ্রেডেবল পণ্য ব্যবহার করতে পারে। আর নাগরিক পর্যায়ে ছোট ছোট অভ্যাস যেমন: কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার, প্লাস্টিক বোতল পুনঃব্যবহার, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জন এবং বাসায় প্লাস্টিক আলাদা করে ফেলা দেশের বর্জ্য সংকটকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
পরিবেশ আমাদের সবার, তাই দায়িত্বও সবার। আজ যদি আমরা প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে সম্মিলিত উদ্যোগ না নিই তবে আগামী প্রজন্মকে ভোগ করতে হবে এমন এক পৃথিবী যেখানে নদী হবে মৃত, মাটি হবে দুর্বল, বায়ু হবে বিষাক্ত এবং খাদ্যচক্রে প্রবেশ করবে প্লাস্টিকের অদৃশ্য কণা। প্রকৃতি আমাদের ক্ষমা করতে জানে কিন্তু ভুলতে জানে না। তাই এখনই সময় প্লাস্টিকের দখল থেকে দেশকে মুক্ত করার, নিজেদের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করার এবং একটি পরিচ্ছন্ন, টেকসই বাংলাদেশ গড়ার।


