মোঃ হামিদুর রহমান লিমন, ক্রাইম রিপোর্টার:
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি যেন নিজের ইতিহাসই ভুলে যেতে বসেছে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের স্মরণ আজ অনেকটাই নির্দিষ্ট কয়েকটি দিবসে সীমাবদ্ধ। বছরের বাকি সময়জুড়ে অবহেলা আর বিস্মৃতির ভারে চাপা পড়ে থাকে শহীদদের স্মৃতি ও আদর্শ।
২১শে ফেব্রুয়ারি, ২৬শে মার্চ ও ১৬ই ডিসেম্বর ঘিরে ভাষা শহীদ ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার সংস্কার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রঙ ও আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়। তবে এসব দিবস পেরিয়ে গেলে অনেক শহীদ মিনারই পড়ে থাকে অযত্নে পরিণত হয় ময়লার ভাগাড়ে।
১৯৮৭ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেন ছিলেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এক অনন্য প্রতীক। পেশায় অটোরিকশা চালক নূর হোসেন বুকে “স্বৈরাচার নিপাত যাক” এবং পিঠে “গণতন্ত্র মুক্তি পাক” স্লোগান লিখে মিছিলে অংশ নেন। পুলিশের গুলিতে নিহত এই সাহসী মানুষটির স্মরণে প্রতি বছর ১০ নভেম্বর দিনটি পালিত হলেও তাঁর আত্মত্যাগের শিক্ষা সমাজে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে? নুর হোসেন চত্বর আজ ব্যানার, পোষ্টারে ঢেকে গেছে।
এরও বহু আগে, অষ্টাদশ শতকে রংপুর কৃষক বিদ্রোহের মহানায়ক নূরলদীন (নূরউদ্দীন মোহাম্মদ বাকের জং) ব্রিটিশ বেনিয়া ও জমিদার দেবী সিংহের নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করেন। ১৭৬০ থেকে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত ইংরেজ শাসন উৎখাতে সংগ্রাম চালিয়ে তিনি ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৭৮৩ সালে প্রাণ হারান। ইতিহাসের পাতায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও আজ তাঁর নাম অনেকের কাছেই অজানা।
সাম্প্রতিক সময়েও ইতিহাস রচিত হয়েছে রক্তে। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের এই শিক্ষার্থী আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন। পুলিশের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দেওয়ার তাঁর দৃশ্য আন্দোলনের গতিপথ পাল্টে দেয়। তবে সময়ের ব্যবধানে তাঁর আত্মত্যাগও যেন স্মৃতির আড়ালে চলে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাঙালির এই দিবসনির্ভর স্মরণপ্রবণতা ইতিহাস চর্চার জন্য উদ্বেগজনক। তাঁদের মতে, শহীদদের স্মরণ শুধু ফুল দেওয়া বা আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁদের আদর্শকে দৈনন্দিন জীবন ও রাষ্ট্রীয় চর্চায় অন্তর্ভুক্ত করাই হওয়া উচিত।
ইতিহাস ভুলে গেলে ভবিষ্যৎও দুর্বল হয়ে পড়ে—এই উপলব্ধিই আজ নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে সচেতন মহলকে।

