শীতের পড়ন্ত সকালে কুয়াশার চাদর ভেদ করে সূর্য ওঠার আগেই সিরাজগঞ্জের গ্রামগুলোতে শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। জেলার সদর, রায়গঞ্জ ও তাড়াশসহ বিভিন্ন উপজেলায় এখন চলছে আখ থেকে গুড় তৈরির মহোৎসব। কোনো প্রকার রাসায়নিক বা ভেজাল ছাড়াই তৈরি হওয়া এই গুড় স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এখন পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
চাষিরা জানান, গুড় তৈরির জন্য প্রথমে মাঠ থেকে আখ কেটে পরিষ্কার করা হয়। এরপর মাড়াই কলের মাধ্যমে আখের রস সংগ্রহ করে বড় টিনের কড়াইয়ে ঢালা হয়। চুলায় কাঠ ও বাঁশের খড়ি দিয়ে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা তীব্র তাপে রস জ্বাল দেওয়ার পর তৈরি হয় ঘন ও সুস্বাদু গুড়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি হওয়ায় এই গুড়ের স্বাদ ও সুগন্ধ অনন্য।
সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ৬৯০ হেক্টর জমিতে আখের চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার আখের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি খাঁটি আখের গুড় ৯০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
আখ চাষিরা তাঁদের এই সাফল্যে বেশ আনন্দিত। স্থানীয় এক চাষি জানান: “প্রতি বিঘা জমিতে আখ চাষে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু সেই আখের রস থেকে গুড় তৈরি করে বিক্রি করলে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পাওয়া যাচ্ছে।”
এই লাভজনক আবাদ সিরাজগঞ্জের গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করে তুলছে। স্বল্প খরচে অধিক লাভ হওয়ায় অনেক কৃষকই এখন ধান বা অন্য ফসলের পাশাপাশি আখ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
গুড় তৈরির কারিগররা জানান, শীতের এই মৌসুমে কয়েক মাস ধরে চলে তাঁদের এই কর্মব্যস্ততা। স্থানীয় বাজারে এই গুড়ের ব্যাপক চাহিদা থাকায় পাইকাররা সরাসরি কৃষকের বাড়ি বা খামার থেকেই গুড় সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন।
সিরাজগঞ্জের এই বিষমুক্ত গুড় শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়, বরং জেলার ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকদের দাবি, সরকারিভাবে ঋণ সহায়তা ও আধুনিক মাড়াই কল সরবরাহ করলে এই খাতের আরও উন্নতি সম্ভব।

