রাজধানী ঢাকার আকাশ ক্রমেই বসবাসের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। টানা কয়েক দিন ধরে ভয়াবহ বায়ুদূষণের কবলে রয়েছে শহরটি। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসের সকালেও বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীগুলোর তালিকায় ওপরের দিকেই অবস্থান করছে ঢাকা, যা নগরবাসীর জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) সকালে বিশ্বের ১২৬টি শহরের মধ্যে বায়ুদূষণের দিক থেকে ঢাকার অবস্থান ছিল তৃতীয়। এদিন রাজধানীর গড় বায়ুমান সূচক (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স—একিউআই) ছিল ২৭৯, যা ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ের মধ্যে পড়ে। শুধু তাই নয়, ঢাকার অন্তত তিনটি এলাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা পৌঁছেছে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ স্তরে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই তথ্য জানিয়েছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউ এয়ার। প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিতভাবে বিশ্বের বিভিন্ন শহরের তাৎক্ষণিক বায়ুদূষণের তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করে থাকে। তাদের লাইভ এয়ার কোয়ালিটি সূচকের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো শহরের বাতাস কতটা নির্মল বা দূষিত—তা নির্ণয় করা হয় এবং সে অনুযায়ী নাগরিকদের সতর্ক করা হয়।
আইকিউ এয়ারের তথ্য অনুযায়ী, এদিন বায়ুদূষণে প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারতের দিল্লি এবং পাকিস্তানের লাহোর। শহর দুটির একিউআই স্কোর যথাক্রমে ৬৩০ ও ৫৪৭, যা ‘চরম বিপজ্জনক’ হিসেবে বিবেচিত। এ তালিকায় ঢাকার অবস্থান তৃতীয় হলেও দূষণের মাত্রা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বায়ুদূষণ এখন আর সাময়িক সমস্যা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটে রূপ নিয়েছে। গত ডিসেম্বর মাসজুড়ে এবং চলতি জানুয়ারি মাসের প্রায় প্রতিদিনই বিশ্বের শীর্ষ দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকার নাম উঠে এসেছে। শীত মৌসুমে নির্মাণকাজ, ইটভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার বর্জ্য এবং বাতাসে ধুলিকণার আধিক্য—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মানদণ্ড অনুযায়ী, বায়ুমান সূচক ২০০ অতিক্রম করলে তা ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ এবং ৩০০ ছাড়ালে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ হিসেবে ধরা হয়। এই মাত্রার দূষণ শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ বা ফুসফুসজনিত রোগে আক্রান্তদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। দীর্ঘদিন এ ধরনের দূষিত বাতাসে বসবাস করলে ফুসফুসের ক্ষতি, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং আয়ু হ্রাসের আশঙ্কা বাড়ে।
আইকিউ এয়ারের পরামর্শ অনুযায়ী, আজ ঢাকাবাসীকে বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। খোলা জায়গায় ব্যায়াম বা দীর্ঘ সময় অবস্থান এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ঘরের জানালা যতটা সম্ভব বন্ধ রেখে ঘরের ভেতরের বাতাস তুলনামূলকভাবে নিরাপদ রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া ঢাকার বায়ুদূষণ পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। অবিলম্বে ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণকাজে ধুলা ব্যবস্থাপনা, যানবাহনের নির্গমন নিয়ন্ত্রণ এবং সবুজায়ন বাড়ানোর মতো কঠোর উদ্যোগ না নিলে রাজধানীর এই সংকট আরও গভীর হবে।

