ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদ—বিশেষ করে দেশটির ভারী ও উচ্চ সালফারযুক্ত অপরিশোধিত তেল—এখন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কৌশলের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর দেশটির তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ নিতে যুক্তরাষ্ট্র যে তৎপরতা চালাচ্ছে, তার পেছনে এই বিশেষ ধরনের তেলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্ববাজারে তেলের ধরন শতাধিক হলেও সান্দ্রতা ও সালফারের মাত্রা অনুযায়ী প্রতিটি তেলের ব্যবহার ও চাহিদা আলাদা। সাধারণত হালকা ও কম সালফারযুক্ত তেল পরিশোধন করা সহজ ও কম ব্যয়বহুল। কিন্তু ভেনেজুয়েলার তেল মূলত ভারী ও ‘সাওয়ার’ বা টক স্বাদের—যা পরিশোধনে জটিল ও ব্যয়বহুল হলেও নির্দিষ্ট ধরনের শোধনাগারের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুদ বর্তমানে ভেনেজুয়েলার দখলে। দেশটির মোট মজুদের পরিমাণ প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল, যার বড় অংশই ওরিনোকো তেল বেল্টে অবস্থিত। তবে দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, প্রযুক্তিগত ঘাটতি এবং অবকাঠামোর অবক্ষয়ের কারণে দেশটির তেল উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
১৯৭০-এর দশকে যেখানে ভেনেজুয়েলার দৈনিক তেল উৎপাদন ছিল প্রায় ৩৫ লাখ ব্যারেল, সেখানে বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৯ লাখ ব্যারেলেরও নিচে। বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে তেল খাতে অন্তত ১১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার তেল খাতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে প্রস্তুত। যদিও নিরাপত্তা ঝুঁকি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক বড় তেল কোম্পানি এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
তবে তেল উত্তোলনকারী কোম্পানিগুলোর দ্বিধা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলোর জন্য ভেনেজুয়েলার তেল বিশেষভাবে লাভজনক। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ হলেও তাদের উৎপাদনের বড় অংশই হালকা শেল অয়েল। অথচ টেক্সাস ও লুইজিয়ানার উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৭০ শতাংশ রিফাইনারি তৈরি করা হয়েছে ভারী তেল প্রক্রিয়াকরণের উপযোগী করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক দশক আগে ভেনেজুয়েলা যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান তেল সরবরাহকারী ছিল, তখনই এসব শোধনাগার ভেনেজুয়েলার তেলের বৈশিষ্ট্য মাথায় রেখে নির্মাণ করা হয়।
বর্তমানে মার্কিন রিফাইনারিগুলো তাদের ভারী তেলের চাহিদা মেটাতে কানাডা থেকে আমদানি নির্ভর। কিন্তু ভেনেজুয়েলার ভারী তেল সাধারণত কানাডার তুলনায় কম দামে পাওয়া যায়, যা শোধনাগারগুলোর মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভেনেজুয়েলা থেকে তেলের সরবরাহ বাড়লে তা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করবে, অন্যদিকে দেশটির রিফাইনারি শিল্পে নতুন করে মুনাফার স্রোত তৈরি করবে।
