যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলার আশঙ্কায় দেশের আকাশপথ পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান। ১৯৭০–এর দশকের ইসলামি বিপ্লবের পর বর্তমানে দেশটিতে চলমান সবচেয়ে ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকার পতন আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার উত্তেজনা দ্রুত যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতেই এই আগাম প্রতিরক্ষামূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং আকাশপথ ব্যবহার করে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় বেসামরিক ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করা হয়েছে।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার একাধিক লক্ষ্যবস্তুর তালিকা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে উপস্থাপন করেছে বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি থেকে সেনা সদস্য ও কূটনৈতিক কর্মীদের আংশিক সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোকেও কড়া বার্তা পাঠিয়েছে। তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—তাদের ভূখণ্ড বা আকাশপথ ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক হামলা চালানো হলে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের পাল্টা আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
ইরানের এই হুঁশিয়ারির পর সৌদি আরব দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তেহরানকে আশ্বস্ত করেছে যে, সৌদি আকাশপথ ব্যবহার করে ইরানের ওপর কোনো হামলা চালাতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে সৌদি আরবে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের চলাচলে সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
এদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন সরকার পতনের দাবিতে রূপ নিয়েছে। এসব আন্দোলন দমনে সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।
ইরানের প্রধান বিচারপতি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, রাজপথে নাশকতা, অগ্নিসংযোগ ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। তবে বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ইরান আপাতত বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। যদিও পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, প্রতিদিন নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বহু সাধারণ মানুষ নিহত হচ্ছেন।
যুদ্ধাবস্থা ঘনীভূত হওয়ায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান সীমিত কূটনৈতিক যোগাযোগও কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে পূর্বনির্ধারিত বৈঠক স্থগিত করা হয়েছে। তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের ধারাবাহিক সামরিক হুমকির কারণে আলোচনার কোনো পরিবেশ আর অবশিষ্ট নেই।
এই উত্তেজনার প্রভাব আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জার্মানির রাজধানী বার্লিনে হাজার হাজার প্রবাসী ইরানি সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে পদযাত্রা করেছেন। অন্যদিকে তেহরানে ব্রিটিশ দূতাবাসের সামনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী সমাবেশ করেছে সরকারপন্থী গোষ্ঠীগুলো।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা এখন নির্ভর করছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

