ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রণীত ২০ দফার শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে এই উদ্যোগকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেমন আলোচনা চলছে, তেমনি বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ একে ইসরায়েলের স্বার্থরক্ষায় সাজানো রাজনৈতিক নাটক হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এই ঘোষণার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের এই পরিকল্পনা এখন আর কেবল যুদ্ধবিরতিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি গাজার নিরস্ত্রীকরণ, টেকনোক্র্যাট শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
উইটকফের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র গাজায় একটি অস্থায়ী প্রশাসন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে উপত্যকার প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা তদারকি করবে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রস্তাবের মাধ্যমে গাজাকে কার্যত আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে নেওয়ার একটি রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে।
মার্কিন বিশেষ দূত স্পষ্ট করে বলেন, যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ সফল করতে হলে হামাসকে তাদের সব দায়বদ্ধতা পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে আটক ইসরায়েলি জিম্মিদের মরদেহ দ্রুত হস্তান্তর অন্যতম শর্ত। অন্যথায় হামাসকে ‘গুরুতর পরিণতি’ ভোগ করতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের দাবির বিপরীতে গাজা সরকারের জনসংযোগ কার্যালয় জানিয়েছে, গত ১০ অক্টোবর থেকে ইসরায়েল অন্তত ১ হাজার ১৯০ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। এসব হামলায় এখন পর্যন্ত চার শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এই বাস্তবতায় যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির এমন নাজুক অবস্থার মধ্যে গাজার নিরস্ত্রীকরণ ও পুনর্গঠনের পরিকল্পনা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে, ফলে পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু করাই এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ২০ দফার পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে, গাজা ইস্যুতে একটি ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন করা হবে এবং সেখানে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, জাতিসংঘের সাবেক বিশেষ দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ এই বোর্ডের নেতৃত্ব দেবেন।
এদিকে কাতার, তুরস্ক ও মিসর গাজায় একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটি গঠনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে। এই কমিটির প্রধান হিসেবে আলি আবদেল হামিদ শাথ–এর নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে এই উদ্যোগকেও সন্দেহের চোখে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।
আল জাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে সরাসরি ‘ইসরায়েলের সাজানো নাটক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, এই পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের মৌলিক অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার প্রশ্ন সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে এবং এটি মূলত ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণের একটি কৌশল মাত্র।
মানবিক দিক থেকে গাজার পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা গাজার সীমান্ত খুলে দিয়ে খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা প্রবেশের দাবি জানালেও ইসরায়েল তা উপেক্ষা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরায়েলের ত্রাণ সরবরাহ নিশ্চিত করার দায় থাকলেও সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে বলেও সমালোচনা উঠেছে।
এদিকে যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও গাজায় ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বুধবার খান ইউনিসে এক চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন এবং গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
