তানভীর তুহিন, স্টাফ রিপোর্টার:
“বাবু সেলাম বারে বারে আমার নাম গয়া বাইদ্যা, বাবু বাড়ি পদ্মা পার।” পল্লীকবি জসিমউদ্দীনের লেখা এই গান কিংবা রূপালি পর্দায় দেখা বেদে জীবনের গল্প—সবখানেই ফুটে ওঠে এক ভিন্ন জীবনধারা। এক সময় নদীই ছিল তাদের ঠিকানা। ছোট নৌকায় করে এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে ভেসে বেড়ানোই ছিল জীবন। নদীর পাড়ে অস্থায়ী বসতি গড়ে লোকজ চিকিৎসা, দাঁতের পোকা বের করা, শিঙ্গা লাগিয়ে বাতের ব্যথা সারানো কিংবা সাপের খেলা দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করত এই যাযাবর জনগোষ্ঠী।
কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই জীবনধারা আজ ইতিহাস। জীবিকার তাগিদে বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ এখন ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার মতো বিভিন্ন এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। হারিয়ে গেছে তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশা। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে জড়িয়ে পড়ছে ভিক্ষাবৃত্তিতে। তবে এটি সাধারণ ভিক্ষা নয়—পথচারীদের হয়রানির মাধ্যমে টাকা আদায় করায় বিব্রত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের মতে, শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবই এই সমস্যার মূল কারণ।
সদরপুর উপজেলার ভুবনেশ্বর নদের তীরে গড়ে ওঠা বেদে পল্লীর চিত্র আরও করুণ। মানবেতর জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে এখানকার মানুষ। বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা—কোনোটিরই নেই নিশ্চিত ব্যবস্থা। মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকায় অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে শিশুদের জীবন। শৈশব থেকেই অনেক শিশু মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। অধিকাংশ শিশুই বিদ্যালয়ের মুখ দেখেনি, এমনকি কেউ কেউ পোলিও টিকাসহ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাও পায়নি। অথচ এত করুণ বাস্তবতায় তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কার্যকর উদ্যোগ নেই সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের।
বেদে সম্প্রদায় সদস্যরা বলেন, মানুষ আগের মতো বেদেদের দিয়ে চিকিৎসা করায় না। সাপের খেলা বা বাদর খেলাও দেখেনা। যে কারনে তাদের আয়ের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। জীবন বাঁচাতে ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিচ্ছেন তারা।
এলাকাবাসী বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অবহেলিত বেদে সম্প্রদায়ের এই বঞ্চনা দূর করতে প্রশাসনকে এগিয়ে আসতে হবে। কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে হয়তো বন্ধ হবে হয়রানিমূলক ভিক্ষাবৃত্তি, আর মূলধারার সমাজে ফিরে আসার সুযোগ পাবে বেদে সম্প্রদায়ের নতুন প্রজন্ম।
সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরীফ শাওন বলেন, এ উপজেলার বেদে সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে শুধু প্রশাসন নয়, এনজিওসহ সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে শীঘ্রই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

