মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর অভিবাসন নীতিতে কঠোর অবস্থান নিয়ে গত এক বছরে এক লাখেরও বেশি বিদেশি নাগরিকের ভিসা বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এটি দেশটির ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ সংখ্যক ভিসা বাতিলের রেকর্ড।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসীদের পাশাপাশি আইন লঙ্ঘনে জড়িত বৈধ ভিসাধারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে শুরু করে। এই নীতির অংশ হিসেবেই ব্যাপক হারে ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করা এবং জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের চিহ্নিত করাই এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য। কর্তৃপক্ষের দাবি, যেসব ব্যক্তি ভিসার শর্ত ভঙ্গ করেছেন বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধেই মূলত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, বাতিল হওয়া ভিসাগুলোর মধ্যে প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থী ভিসা এবং আড়াই হাজারের বেশি উচ্চদক্ষতা সম্পন্ন কর্মীর ভিসা (এইচ-১বি ও এল-১বি ক্যাটাগরি) রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের উপ-মুখপাত্র টমি পিগোট জানান, ভিসা বাতিলের পেছনে চারটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, সহিংসতা বা শারীরিক হামলার মতো অপরাধ এবং চুরির ঘটনায় জড়িত থাকা। তিনি আরও জানান, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ভিসা বাতিলের হার প্রায় দেড় গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
মার্কিন প্রশাসন স্পষ্ট করেছে, অপরাধে জড়িত বিদেশি নাগরিকদের দেশ থেকে বহিষ্কার এবং ভিসা বাতিলের এই কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। এ লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি বৈধ ভিসাধারীর তথ্য পুনরায় যাচাইয়ের জন্য একটি বিশেষ সংস্থা—‘কন্টিনিউয়াস ভেটিং সেন্টার’ গঠন করা হয়েছে। এই কেন্দ্র সার্বক্ষণিকভাবে বিদেশি নাগরিকদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করবে এবং আইন ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে নতুন ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রেও নীতিমালায় কড়াকড়ি আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ভিসা আবেদনকারীদের ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি ‘পাবলিক চার্জ’ নীতির আওতায় যাদের ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাদের আবেদন সরাসরি বাতিল করা হচ্ছে।
এই কঠোর অভিবাসন নীতির প্রভাব পড়েছে পর্যটক, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণির বিদেশি নাগরিকদের ওপর। বিশেষ করে ভারত ও চীনের মতো দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা পাওয়া ও ধরে রাখা এখন আগের তুলনায় অনেক কঠিন হয়ে উঠেছে।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, অপরাধ দমনের নামে অনেক ক্ষেত্রেই নিরপরাধ ব্যক্তিদেরও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে এবং দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এসব সমালোচনার জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা কোনো অধিকার নয়; এটি একটি সুযোগ, যা দেশের আইন লঙ্ঘন করলে যেকোনো সময় প্রত্যাহার করা হতে পারে।
