ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কৃষক দিশেহারা

এস এম আব্দুল্লাহ সউদ, কালাই উপজেলার প্রতিনিধিঃ
কৃষকরা ভালো নেই।কারণ তারা নায্য বাজার মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।এবারের চলতি মৌসুমে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও ধানের বাজারের অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কারসাজিতে বেশ টান পড়েছে। অন্যদিকে ধানের সিন্ডিকেটের পোয়াবারো। চলতি মৌসুমে বোরো ধানের দাম দু- সপ্তাহ খানেকের মধ্যে কমেছে ৩০০/৩৫০ টাকা। ধান ব্যবসায়ীরা এতে “দাঁতে ধার”দিলেও ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন চাষিরা।
ধান উৎপাদনে উত্তরাঞ্চলের জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলা হলো অন্যতম। চলতি মৌসুমে ১২ হাজার ৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। গত বছর ধানের বাজার মূল্য বেশি পাওয়ায় এ বছর কৃষক তাদের সবজি ফসল লাগানো জমিতে ধান লাগানোর ফলে ৫০ হেক্টর বেশি জমিতে ধান চাষ হয়েছে। ফলে এ বছর  চলতি মৌসুমে উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রা যা ছিল তাই অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু নানা কারণে সেই কৃষকরাই ভাল নেই। ধান উৎপাদন করে নিজেরা যেন স্থানীয় সিন্ডিকেটের কাছে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। উৎপাদিত ধান নিয়ে ছলচাতুরীর মাধ্যমে ফুলেফেঁপে বড় হচ্ছে স্থানীয় ফড়িয়া, মজুদদার ও চাতাল,মিল মালিকরা। অন্যদিকে,ধান উৎপাদন করে ঋণ পরিশোধ করতেই হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা।
কৃষকদের অভিযোগ,নানা কারণে তারা ভাল নেই। ধান উৎপাদন করে নিজেরা যেন স্থানীয় সিন্ডিকেটের কাছে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। উৎপাদিত ধান নিয়ে ছলচাতুরীর মাধ্যমে ফুলেফেঁপে বড় হচ্ছে স্থানীয় ফড়িয়া, মজুদদার ও চাতাল,মিল মালিকরা। অন্যদিকে,ধান উৎপাদন করে ঋণ পরিশোধ করতেই হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা।  ব্যবসায়ীরা জোটবদ্ধ হয়ে প্রতিদিন ধীর গতিতে কম দামে ধান কিনছেন। সেই সাথে অন্য এলাকা থেকে ধান ক্রয় করতে আসা ব্যবসায়ীদের বাজারগুলোতে নামতে দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে কৃষকরা মোটা অংকের লোকসানে থাকলেও কৌশলে এলাকার চাতাল-মিল মালিক, ফড়িয়া ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কম দামে ধান কিনে অল্পতেই বেশী লাভ করছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, গতবারের চেয়ে এবার ধানের ফলন ভাল হওয়ায় বাজারে আমদানী বেশী হয়েছে আবার অনেকেই ধান না শুকিয়ে ভেজা অবস্থাতেই বিক্রি করতে আনছেন বলেই ধানের দাম কম।
কালাই উপজেলার ধানের বিভিন্ন বাজারে গিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে জানা যায়, সপ্তাহখানেক আগে প্রতি মণ কাটারি জাতের ধান (৪০ কেজি) ১৩৫০ থেকে ১৪০০ টাকা, জিরাশাইল ১২৫০ থেকে ১৩০০ টাকা, মোটা জাতের আতপ ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ আজ শনিবার বাজারে সেই কাটারি জাতের ধান প্রতি মণ ১০০০ থেকে ১০৫০ টাকায়, জিরাশাইল ১১০০ থেকে ১১৫০ টাকা, মোটা আতপ ৯০০ টাকা থেকে ৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে গড়ে প্রতি মণে কমে গেছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। কৃষকরা আরো বলেন, এবার প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ হয়েছে ১৪/১৫ হাজার টাকা। বাজারে সব জিনিসের দাম বেশি। আবার ধানের দামও কমে গেছে। কিভাবে কৃষকরা দু’পয়সা বেশি পাবে সেটা নিয়ে কারো মাথাব্যাথা নেই।বঞ্চিত হওয়ার খাতায় সবসময় কৃষকরা-ই থাকছে।
আজ সকাল থেকেই কালাই পৌর মহাসড়কের দুই পাশে ধান বোঝাই সারি সারি ভ্যান ও ভটভটি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। সকালে উপজেলার বিখ্যাত ধানের হাট পাঁচশিরা বাজারে ধান বিক্রি করতে আসা  উপজেলার বাইগুনী গ্রামের শহিদুল ইসলাম বলেন, তিনটি ভটভটিতে ৬০ মণ দুই জাতের ধান বাজারে এনে বড় বিপদে পড়েছি। ধান কেনার জন্য তেমন লোকজনই আজ হাটে আসেনি। শুনতে পেলাম স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বাহিরের ব্যবসায়ীদের আজ এই হাটে নামতে দেয়নি। তারা নিজেরাই সিন্ডিকেট করে কম দামে ধান কিনবে। বাধ্য হয়ে ধান বাড়িতে ঘুরে নিয়ে যাচ্ছি। কিভাবে ধান কাটার শ্রমিকদের বিদায় করবো তা ভেবে পাচ্ছিনা!!
হাতিয়র গ্রামের কৃষক জালালুদ্দিন মন্ডল বলেন, শুরুতে ধান বিক্রি না করে বড় ভুল করেছি। আজ তার খেশারত গুনতে হচ্ছে। ধান ধরে রাখলাম লাভের আশায়, এখন লাভ তো দূরের কথা উল্টো মূল তহবিলে লোকশান গুনতে হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতে ধানের বিকল্প ফসল ফলানোর চিন্তা না করে কোনো উপায় নেই।
পৌর এলাকার কৃষক আলমগীর মিয়া বলেন, ‘ধানের বাজার বেশি কমে গেলে আমরা টিকে থাকতে পারব না।দাম কমার প্রভাব পড়লেও বৃদ্ধির সুবিধা থেকে বরাবরের মতো এবারও বঞ্চিত হবে কৃষকরা। তখন অর্থনৈতিকভাবে বিপদে পড়তে হবে আমাদের। আমাদের দাবি, বাজারে দামের ভারসাম্য যেন ঠিক রাখে কর্তৃপক্ষ।’
ধানের দাম কম হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে মহিমাগঞ্জ থেকে আসা তরিকুল ইসলাম নামে এক ধানের ব্যাপারি বলেন, সরকার ধানের দাম ১২০০ টাকা মণ নির্ধারণ করেছে। এ অবস্থায় মিলাররা এর চেয়ে বেশি দামে ধান কিনতে চায় না। সিজনের শুরুতে মিলাররা ৯০০/৯৫০ টাকা মণ দরে ধান কিনে মজুদ করেছে। এখন তারা সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে চায় না। তাই আমাদেরও কৃষকদের কাছ থেকে এ দামেই কিনতে হচ্ছে। সরকার যদি ধানের দাম বাড়ায় তাহলে হয়তো কৃষকরা আরও ভাল দাম পাবে।
সিন্ডিকেট করে হয়ে ধান ক্রয় এবং অন্য জেলার ব্যবসায়ীদের ধান কিনতে না দেওয়ার বিষয় পুরা অস্বীকার করে উপজেলা চাউল কল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল আজিজ মন্ডল বলেন, এলাকার প্রত্যেক ব্যবসায়ীর গুদামে গত আমন ও বোরো মৌসুমের ধান-চাল এখনও পর্যাপ্ত পরিমান মজুত রয়ে গেছে। তা ছাড়া মিলাররা এখনও ব্যাপক হারে ধান কিনতে শুরুই করেননি। সবকিছু মিলে হয়ত বর্তমানে ধানের বাজার নিম্নমুখী হয়েছে। মিলাররা পুরোদমে ক্রয় করা শুরু করলেই ধানের দাম আবারও বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অরুণ কুমার রায় বলেন, বাজারে ধানের আমদানি বেড়ে গেছে। সে কারণে ধানের দাম কমতে পারে। আবার স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণেও ধানের দাম কমতে পারে। আমরা বিষয়টি মাথায় নিয়েছি। আমরা বাজার মনিটরিং অব্যাহত রেখেছি।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

লাইভ রেডিও
সর্বশেষ সংবাদ