আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস আজ

সদরুল আইনঃ
পৃথিবীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যতো ইতিহাস জমা হচ্ছে তারই প্রতিচ্ছবি হলো জাদুঘর। জাদুঘরের ইংরেজি মিউজিয়াম শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ মিউজয়ন থেকে, যার অর্থ কাব্যাদির অধিষ্ঠাত্রী দেবীর মন্দির। বাংলায় জাদুঘর কথাটির অর্থ হলো, যে গৃহে আদ্ভুত পদার্থসমূহ সংরক্ষিত আছে এবং যা দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হতে হয়।
আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস আজ। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘পাওয়ার অব মিউজিয়াম’। বরাবরের মতো দিনটিতে জাদুঘরের তাৎপর্য তুলে ধরা হয়— যাতে ছাত্র, শিক্ষক, গবেষক ও পণ্ডিত ব্যক্তিদের গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং নাগরিকরা তার আপন ঐতিহ্য সম্পর্কে ভাবতে শেখেন।
ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামসের আহ্বানে ১৯৭৭ সালে প্রথম বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়। সেই থেকে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামস (আইসিওএম)। এর সদস্য হিসেবে বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের মোট ১৮০টি দেশের ২৮ হাজার জাদুঘর যুক্ত রয়েছে।
জানা গেছে, বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল জনগণের চাহিদা শুনে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করার কথা ভাবেন। কিন্তু তাতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ১৯১১ এর বঙ্গভঙ্গ, ১৯১২ সালের দিকে তিনি দেশের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ করেন, যারা বেশ কিছু পুরনো সামগ্রীর প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন।
 প্রদর্শনীটি দেখে লর্ড কারমাইকেল মুগ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ঢাকায় একটি জাদুঘর তৈরি করবেন। ২ হাজার রুপি দান করেন জাদুঘরটির কাজ শুরু করার জন্য। জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করতে যে দুজন মানুষ সবচেয়ে বেশী অবদান রেখেছিলেন তারা হলেন, এম বনহ্যাম কারটার এবং স্যার নিকোলাস ডড বেটসন বেল।
১৯১৩ সালের ৭ই আগস্ট, পুরাতন সচিবালয়ের একটি কক্ষ নিয়ে প্রথম ঢাকা জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়। ১৯১৪ সালে প্রথম ৩৭৯ টি নিদর্শন এবং ৩০ জন কর্মচারি নিয়ে শুরু হয় জাদুঘরের প্রদর্শনী। একই সালে বাবু নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রথম কিউরেটর হিসেবে নিযুক্ত হন।
 নলিনীকান্ত ভট্টশালী ছিলেন বিচক্ষণ ব্যক্তি। তিনি নিজে জাদুঘরের তদারকি করতেন।একদিন তার মনে হল জাদুঘরের সংগ্রহ বাড়ানো উচিত। আস্তে আস্তে জাদুঘরের সংগ্রহের জিনিস সংখ্যা বাড়ানো শুরু হল। একই বিল্ডিং এর আরো দুইটি রুম জাদুঘর ব্যবহার করা শুরু করলো।
সংগ্রহের পরিমাণ বাড়তে বাড়তে একসময় যখন তিনটে রুমেও জায়গা হলোনা, তখন সেখান থেকে জাদুঘরটি সরিয়ে নেয়া হল নিমতলীতে নায়েব নাজিমের বারোদূয়ারী ভবনে। ১৯৪৭ সালে নলিনীকান্ত ভট্টশালীর মৃত্যুর পর চার বছর জাদুঘরটি কিউরেটরবিহীন থাকে।
 যার ফলে পরবর্তীতে ১৯৫১ সাল থেকে ১৯৬২ সাল অবদি জাদুঘরটি চলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে। এসময় এনামুল হক নামে একজন সহকারী কিউরেটর হিসেবে নিয়োগ পান এবং পরবর্তীতে তিনি পদোন্নতি পেয়ে কিউরেটর হন।  এসময় দেশের বিভিন্ন ভাগ থেকে রাজা এবং জমিদারদের পক্ষ থেকে বহু মূল্যবান নিদর্শন জাদুঘরে আনা হয়।
অবশেষে ১৯৮৩ সালে জাদুঘরটি শাহবাগে স্থানান্তর করা হয়। আট একর জায়গা নিয়ে জাদুঘরটি স্থাপিত হয়। চারতলা বিশিষ্ট ভবনটির স্থাপত্য নকশা অত্যন্ত নজরকাড়া।
 ২০ হাজার বর্গমিটারের ভবনটির ৪৫টি গ্যালারিতে রয়েছে প্রায় ৮৩ হাজারের বেশি নিদর্শন। কেবল বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এটি সর্ববৃহৎ জাদুঘর।
আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর প্রতিবছর বর্ণাঢ্য র‌্যালি, বিষয়ভিত্তিক সেমিনার ও বিশেষ প্রদর্শনী আয়োজন করে থাকে। প্রতিবছরের মতো এবারও বিস্তারিত কর্মসূচি রয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯১০ সালের এপ্রিলে দিঘাপতিয়া রাজপরিবারের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতায় শরৎকুমার রায়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর’ হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর। এটি নির্মাণ শেষ হয় ১৯১৩ সালে।
বাংলাদেশে শতাধিক জাদুঘর আছে। তবে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরই দেশের প্রধান জাদুঘর হিসেবে বিবেচিত।
জাদুঘর হল সমাজ, জাতি ও দেশের দর্পণ। একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতিকে দেশী-বিদেশী দর্শকের কাছে তুলে ধরতে জাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
অতীতে জাদুঘরকে একটি একক, স্বতন্ত্র এবং বিচ্ছিন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা হত। কিন্তু বর্তমান কালের ধারণা অনুযায়ী জাদুঘরকে সমাজ সম্মিলন কেন্দ্র ও শিক্ষালয় হিসেবে ধরা হয়।
 বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী উপলব্ধি লক্ষ্য করা যায়, জাদুঘরসমূহ জাতীয় সচেতনতা বৃদ্ধিতে ব্যাপকভিত্তিক অবদান রাখতে পারে এবং জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কিত নিদর্শন কেন্দ্রিক প্রামাণ্য শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে জাদুঘরই আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

বিষয়: * আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস আজ
সর্বশেষ সংবাদ