মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে ইস্যুতে শক্ত অবস্থানে দুই দেশ

 

আহমাদুল কবির, মালয়েশিয়া প্রতিনিধিঃ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ইস্যুতে দুই দেশের মন্ত্রী যার যার অবস্থান থেকে অনড় রয়েছেন। এই অবস্থানের কারনে কবে নাগাদ কর্মী পাঠানোর দ্বার উম্মোচন হবে সে আশায় রয়েছেন সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়িরা।

মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ সীমিত সংখ্যক বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্টের (বিআরএ) মাধ্যমে বাংলাদেশি অভিবাসীদের নিয়োগ দিতে চায় বলে নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনও স্থগিত রয়েছে। মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে,সকল রিক্রুটিং এজেন্সিকে দায়িত্ব দিয়ে ডাম্পিং গ্রাউন্ড করা যাবে না। আর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সিন্ডিকেটের পক্ষেও না,বিপক্ষেও না, কর্মী পাঠানোর পক্ষে।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সমস্ত বৈধ সংস্থাকে তার তত্ত্বাবধানে কর্মী পাঠানোর অনুমতি দিতে চায় এবং বিদেশি চাকরিপ্রার্থীদের মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসন নিশ্চিত করতে চায় বাংলাদেশ। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠাতে গেল বছরের ১৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সাথে সমঝোতা স্মারক সই করে দুই দেশ।

এরপর চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি এক চিঠির মাধ্যমে দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের সকল রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য শ্রমবাজারটি উন্মুক্ত করা হবে না। ২৫ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে আরও ২৫০টি এজেন্সি সহযোগী হিসেবে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে পারবে। এই প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়ে ১৮ জনুয়ারি পাল্টা চিঠি দেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ। একমাস পর ১৮ ফেব্রুয়ারি কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে আরেকটি চিঠি দেয়া হয় মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মানবসম্পদ মন্ত্রীকে। সেই চিঠিতে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা নির্বাচনে স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল পদ্ধতি এবং দুদেশের অনলাইন পদ্ধতি যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর জন্য একটি যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠক আহ্বান করতে অনুরোধ জানানো হয় সেই চিঠিতে। যদিও এর কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি মালয়েশিয়া। উল্টো ১০ মার্চ মালয়োর মানবসম্পদমন্ত্রী এম সারাভানান প্রকাশ্যে জানিয়ে দিলেন,সকল রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করবে না মালয়েশিয়া।

দেশটির মানবসম্পদমন্ত্রী এমসারাভানান বলেছেন, প্রতিটি দেশে কয়েক হাজার এজেন্সি আছে। সবাইকে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দিয়ে মালয়েশিয়ায় ডাম্পিং গ্রাউন্ড করতে চাই না। জোর করে শ্রমে বাধ্য করার অভিযোগ ইস্যুতে গত ১০ মার্চ দেশটির বিভিন্ন সংস্থা, বিদেশি প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। এই মতবিনিময়ে নানা বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দেন এম সারাভানান।

তিনি বলেন, এটানিশ্চিত করতে চাই যে আমরা শ্রমিকদের জোর করে অতিরিক্ত কাজে বাধ্য করার বিরুদ্ধে লড়াই করছি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আমার সহকর্মীদের প্রতি বিনীত অনুরোধ করছি যে, এজেন্সি দ্বারা সোর্স কান্ট্রিতে কর্মীরা যেনো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এ কারণেই আমি বিদেশি কর্মী আনতে এজেন্সি সীমিত করেছি।

তিনি আরও বলেন, প্রতিটি দেশে কয়েক হাজার এজেন্সি আছে। আমি সবাইকে কর্মী আনতে দিতে পারি না। আমি এখানে ডাম্পিং গ্রাউন্ড করতে চাই না।

এম সারাভানান বলেন, আমি যখন এজেন্সিগুলো সীমিত করেছি তখন, কেউ কেউ বলেন কেন সীমিত করতে হবে? অনেকে বলেন, আপনি কেন নিয়ন্ত্রণ করছেন? আপনি যতক্ষণ আমার স্থানে না আসবেন, ততক্ষণ আপনি বুঝবেন না।

মানবসম্পদমন্ত্রী বলেন, আমি সারা বিশ্বে আমার সহকর্মীদের, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যকে অনুরোধ করছি, আমাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সহায়তা করার আহবান জানান। আমরা সঠিক পথেই আছি। আর সোর্স কান্ট্রির কারণে যেনো কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং এখানে শিল্প কারখানাতেও যেনো কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটা নিশ্চিত করা হবে।

এদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ বলেন, আমরা আমাদের অভিবাসীদের পাঠাতে প্রস্তুত। কিন্তু বাংলাদেশ এমন কোনো সিন্ডিকেটকে অনুমতি দেবে না যা আবার বাজার কারসাজি করতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন, আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। তারা যদি লোক নিয়োগ করতে চায়, আমরা অন্যান্য কর্মী প্রেরণকারী দেশগুলির দ্বারা রক্ষিত মানক পদ্ধতি অনুসরণ করব।

সিন্ডিকেশন বিরোধী আন্দোলনের নেতা বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, এমওইউ কার্যকর করার জন্য এসওপি চূড়ান্ত করার পরই বাজার খোলা যাবে। কিন্তু, দুই সরকার এখনও এসওপি চূড়ান্ত করার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সিন্ডিকেট বিপুল পরিমাণ অর্থ পকেটস্থ করার জন্য ২৫টি এজেন্সির মাধ্যমে বাংলাদেশি অভিবাসীদের নিয়োগের জন্য মালয়েশিয়া সরকারকে প্রভাবিত করছে বলে জানান তিনি।

আলী হায়দার বলেন, সিন্ডিকেটের কারণে বাজার পুনরায় চালু করতে আমাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের কারণে গতবার মালয়েশিয়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষ চাকরি পেতে ব্যর্থ হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ এখনো তাদের টাকা ফেরত পাননি। দেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলি মর্যাদা ও স্বচ্ছতার সাথে অভিবাসীদের পাঠিয়ে ন্যায্য ব্যবসা করতে চায়। বাংলাদেশও সিন্ডিকেট ইস্যুতে তার অবস্থান পরিষ্কার করেছে এবং অনুমতি দেওয়ার জন্য মালয়েশিয়াকে চিঠি দিয়েছে।

দ্রুত বাজার পুনরায় খোলার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা সমঝোতা স্মারক অনুসরণ করে কর্মী পাঠাতে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। এ দিকে মালয়েশিয়ায় সিক্যাটাগরির অধীনে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৫০১টি কর্মসংস্থান সংস্থা বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য আবেদন করার ক্ষেত্রে সেবা প্রদান করতে পারবে। ১৭ মার্চ এক বিবৃতিতে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী দাতুক সেরি এম সারাভানান।

তিনি জানান, মালয়েশিয়ায় উৎপাদন, বৃক্ষরোপণ, পরিষেবা, নির্মাণ ও কৃষিতে কর্মী নিয়োগে এখন পর্যন্ত সেক্টরগুলোর নিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৩ লাখ ১৩ হাজার ১৪ জন বিদেশি কর্মীর আবেদন জমা পড়েছে, যা বর্তমানে পর্যায়ক্রমে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত বিদেশি কর্মীদের আবেদনপত্র জমা পড়েছে উৎপাদন খাতে ১ লাখ ৯৩ হাজার ৩৪৬ জন, পরিষেবা খাতে ৪৮ হাজার ১১৯ জন, বৃক্ষরোপণ খাতে ৩৬ হাজার ৯৫০ জন, নির্মাণ খাতে ২৭ হাজার ৩৩১ জন, কৃষি খাতে ৭ হাজার ২৪৮ জন এবং খনি ও খনন খাতে ২০ জন।

এ বিষয়ে তিনি জানান, প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলে শ্রমিকদের সব খাতের জন্য অনুমতি দেওয়া হবে। এছাড়া যদি কোনো বেসরকারি কর্মসংস্থান সংস্থা বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য আবেদনপত্রের এই নিয়মের অপব্যবহার করে তাহলে ০৩-৮৮৮৬ ৫১৯২ এই নম্বরে দেশটির জনশক্তি বিভাগে জানানোর অনুরোধ করেন এমসারাভানান। গত ১০ ডিসেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদিত খাতগুলোর জন্য বিদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়ে একমত হয়।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
বিষয়: * মালয়েশিয়া * শক্ত অবস্থান * শ্রমবাজার
লাইভ রেডিও
সর্বশেষ সংবাদ