“বঙ্গবন্ধু জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে স্বাধীনতা ও নিজস্ব পরিচয় পেয়েছি”


মোঃ জাহিদ হাসান মিলু, জেলা প্রতিনিধি ঠাকুরগাঁও:

মার্চ মাসে যে ব্যক্তিটি সর্বাগ্রে চোখের সামনে উদ্ভাসিত হন তিঁনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর মতো নেতা আমরা হাজার বছর অপেক্ষা করলেও আর পাবো কিনা সন্দেহ। বঙ্গবন্ধু জন্মেছিলেন বলে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। তিঁনি এদেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে আমরা একটা নিজেস্ব পরিচয় পেয়েছি। উনি এমনি এক নেতা। শুধু নেতাই না উনি দূরদর্শী সম্পন্ন একজন মানুষও ছিলেন। আপাদমস্তক উনি একজন বাঙালি। নির্ভেজাল বাঙালি বলতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বুঝায় বলে স্মৃতিচারণ করে বলেন, জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান বাবলু।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলার রাখাল রাজা, যার নামে ইতিহাসের দরজা খুলে যায়। যিনি দুহাত প্রসারিত করলে, অনায়াসে ছুঁতে পারে ৫৬ হাজার বর্গমাইল সেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান বাবলু বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কে বলতে গেলে অনেক পড়াশোনার প্রয়োজন আছে। বাংলাদেশ মানে বঙ্গবন্ধু আর বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুকে জানতে হলে বাংলাদেশকে জানতে হবে। বাংলাদেশকে জানতে হলে বঙ্গবন্ধুকে জানতে ও মানতে হবে।,

১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুহুানে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হওয়ার পরে বঙ্গবন্ধু সারা বাংলাদেশ সফরে বেড় হয়েছিলেন। তখন সর্বপ্রথম তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে সফর করেন। এর পর ১৯৭২ সালে তিনি আবার ঠাকুরগাঁওয়ে আসেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান বাবলু তখন ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। সেই সুবাদে বঙ্গবন্ধুর সাথে ঠাকুরগাঁওয়ে দুইবার সাক্ষাৎ হয় বাবলু’র। যার কারণে বঙ্গবন্ধুর সাথে তার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে বলে জানান তিনি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান বাবলু ঠাকুরগাঁও শহরের আশ্রমপাড়ার বাসিন্দা। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ৯ মাস যুদ্ধ করেছেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান বাবলু বলেন, ‘১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু যখন নির্বাচনী কর্মীসভা করতে ঠাকুরগাঁওয়ে আসেন। সেই দিনটির কথা আমার পরিষ্কার মনে আছে। সে সময় সনাতন ধর্মাবলীর দুলাল সেন নামে একজন আমাকে মামা বলে ডাকতো। দুলাল সেন আমাকে প্রায় বলতো, যে মামা বঙ্গবন্ধু যদি কোনদিন ঠাকুরগাঁওয়ে আসেন তাহলে একবারের জন্যে হলেও তাঁর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে। কারণ বঙ্গবন্ধুকে স্বচোক্ষে দেখার দুলালের খুব ইচ্ছা ছিল। বঙ্গবন্ধু ১৯৬৯ সালে ৭০ এর নির্বাচনের প্রস্তুতি সভা করতে ঠাকুরগাঁওয়ের পুরাতন বলাকা সিনেমা হলে আসেন। তখন দুলাল সেনকে সেখানে নিয়ে যাই। ওইদনি যখন বঙ্গবন্ধু সভায় বক্তৃতা দেন তখন আজগর ভাই সিনেমা হলের তৃতীয় শ্রেণির গেটে ভিআইপি মানুষদের চেক করে হলের ভিতরে প্রবেশ করাচ্ছিলেন। মানুষ ভিতরে প্রবেশ করার জন্য গেট খুলা লাগাতে সূর্যের আলো বঙ্গবন্ধুর চোখে গিয়ে পড়ছিল। এতে বক্তব্য দিতে সমস্যা হচ্ছিল বঙ্গবন্ধুর। তিন বার এমন হওয়াতে চতুর্থবার বঙ্গবন্ধু বজ্র কন্ঠে বলেন, এই আজগর হয় দরজা খুলে দাও নয়তো বন্ধ করে দাও। তিঁনার এই কন্ঠ আজও আমি ভুলিনি।,

‘সভা শেষে বঙ্গবন্ধু ঠাকুরগাঁওয়ের ডাক বাংলোয় যান। একসময় দেখি বঙ্গবন্ধু রিক্সা নিয়ে শহরের বাবু এ্যাডভোকেট এর বাসার সামনে এসে রিক্সাটিকে ছেড়ে দিয়ে চৌরাস্তার দিকে হেটে আসছেন। সেসময় আমরা ছাত্রলীগের ৭-৮জন একসাথে ছিলাম। বঙ্গবন্ধুকে একাই হাটতে দেখে আমরা তার পিঁছু হাটি। তিনি আমাদের দেখে বলেন, তোমরা কি আমার সাথে যাবা? গেলে চল। তখন আমরা তার সাথে হেটে গোধুলি বাজার গেলাম। সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম, বঙ্গবন্ধুর এক আত্মীয় গোধুলি বাজারে এক বাসায় ভাড়া থাকতেন। তিনি তাঁর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে সেখানে যান। সাক্ষাৎ শেষে খাওয়া দাওয়া করার জন্য আমাদের বাসায় ফিরে যেতে বলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু আবার রিক্সা নিয়ে চলে যান ডাক বাংলোয়।,

‘পরে আমার সাথে সাবেদ, নান্নু, লাকী, জুলফু, মান্নাফ, নকুল, আনিসুরসহ কয়েকজন আমরা বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করতে যাই ডাক বাংলোতে। তখন বঙ্গবন্ধু আমাকে বলেন এই বাবলু, তোরা তো ছাত্রলীগ করিস অনেক দিন থেকেই, বলতো তোদের এখানে একজন বিশাল বড় নেতা আছে। তিনি কে? সত্যি কথা বলতে আমরা সেদিন তাঁর প্রশ্নে উত্তর কেউ দিতে পারিনি। তাতে আমরা খুব লজ্জিত হয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু তখন রাগান্বিত হয়ে বলেন, তোরা ছাত্র লীগ করিস? তোরা তোদের এখানকার নেতাকেই চিনিস না? কি ছাত্রলীগ করো? আমি রিক্সা নিয়ে শহর ঘুরে দেখলাম সেই নেতার কোন স্মৃতিস্তম্ভ নেই। সেই নেতা হচ্ছেন, এ্যাডভোকেট দবিরুল ইসলাম। যিনি ছাত্রীলীগের প্রথম সভাপতি ও প্রতিষ্ঠাতা এবং ভাষা সৈনিক ছিলেন। তার নাম তোমরা বলতে পারো না! এ্যাডভোকেট দবিরুল ইসলাম আমার বন্ধু মানুষ। উনি যদি আজ বেঁচে থাকতেন আমার মতোই নেতা হতেন তিনি। ,

‘আমরা সেদিন সত্যিই লজ্জা পেয়েছিলাম কারণ সেদিন আমরা এ্যাডভোকেট দবিরুল ইসলামের নাম বলতে পারিনি। বঙ্গবন্ধু বলেন, তোমাদের সিনিয়র ভাইরা কোথায় গেল? আমার কথা তাদের বলবা। আমি নির্দেশ দিলাম ২৪ ঘন্টার মধ্যে যেন দবিরুলের স্মৃতিস্তম্ভ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর যে কথা সেই কাজ। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই পাবলিক ক্লাবে এ্যাডভোকেট দবিরুল ইসলামের ছোট্ট একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয় তখন। পরবর্তীতে সেইটিকেই বড় করা হয়েছে।,

‘এর পর বঙ্গবন্ধু আমাকে বলেন তুই যাবি আমার সাথে পঞ্চগড়ে চল? ওই দিন বঙ্গবন্ধু শুধু এমনি বলেছিল তাঁর সাথে যাওয়ার জন্য। আর আমরাও ইচ্ছা করে যেতে চাইলাম তাঁর সাথে। তখন আমি ও রহিম ভাই বঙ্গবন্ধুর গাড়িতে পঞ্চগড় যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেই। আমাদের পঞ্চগড় যাওয়ার কারণ ছিল, আমরা জানতে পেরেছিলাম যে, পঞ্চগড়ে নির্বাচন নিয়ে প্রচন্ড গ্রুপিং চলছে। শোনা যাচ্ছিল ডা. ইসমাইল এবার নমিনেশন পাবে। অন্যদিকে কমির উদ্দীন মুক্তার অনেক বয়ষ্ক হয়ে গেছেন তাই তিনি ঠিক মতো ক্যাম্পেইন করতে পারবেন না। আর তখন ছাত্রলীগসহ সব নেতাকর্মীরা ইসমাইলের দিকে ছিল। তাই আমরা দেখতে গিয়েছিলাম যে বঙ্গবন্ধু কিভাবে এই গ্রুপিংটা নিরসন করেন তা দেখতে।,

‘গাড়ি পঞ্চগড় এর বোদা বাজারে পৌঁছালে ডা. ইসমাইলের বাড়ির গেটের সামনে বঙ্গবন্ধু গাড়ি থামলো। গেট থেকে ইসমাইলকে বঙ্গবন্ধু ডাকতে শুরু করেন। ইসমাইল বঙ্গবন্ধুর গলা পেয়ে কাপড় পরে বেড়িয়ে এলেন। বঙ্গবন্ধু ইসমাইলকেও তাঁর গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে পঞ্চগড়ের দিকে রওনা দিলেন। ময়দান দিঘি আসতে আসতেই পথিমধ্যে বঙ্গবন্ধু ইসমাইলের কাঁধে হাত রেখে বলেন, ইসমাইল আমি তো তোমাদের নেতা। আমি যদি কোন ভুল করি তাহলে কি তোমরা আমাকে ক্ষমা করবে না? ইসমাইল অবাক হয়ে বলল, কি বলেন লিডার? আপনি ভুল করেছেন বুঝতে পেরে ক্ষমা চাইবেন আর আমরা ক্ষমা করবো না? অবশ্যই করবো। তখন বঙ্গবন্ধু বলেন, আমাকে ক্ষমা করে দিও এবার তোমাকে নমিনেশন দিতে পারবো না। এভাবেই বঙ্গবন্ধুর লিডারশিপের কারিশমা দেখেছিলাম ওই দিন।,

‘কিছুক্ষণ পর পঞ্চগড়ে পৌঁছালাম। পঞ্চগড়ে নির্বাচনী সভার মঞ্চে শাহ মাহাতাব, এ্যাড. রহিম, এ্যাড. আমজাদ, আজিজুর রহমান এমএলএ, ফজলুল করিম, রশিদ মুক্তার, লতিব মুক্তার, খাদেমুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলামসহ ২২ জন বড় বড় নেতা বসেছিলেন। ওইদিন প্রোগ্রামে পৌঁছাতে বঙ্গবন্ধুর প্রায় ২ ঘন্টা দেরি হয়। তাই তিঁনি গাড়ি থেকে নেমেই আগে মঞ্চের মাইক ফিস (মাইক্রোফোন) এর কাছে গিয়ে বিনয়ের সাথে বলেন, আমার আসতে দুই ঘন্টা দেরি হয়ে গেছে তাই আমি জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। বাকি দের বক্তব্য দিতে দিবনা। কারণ এদের বক্তব্য দিতে দিলে তাই আরও অনেক দেরি হবে। তাই আমি একাই বক্তব্য দিব। বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তব্যে বলেন, আমার বক্তব্যতো অনেক শুনেছেন আপনারা। আজকে আমি বক্তব্য না দিয়ে একটি গল্প শোনাবো আপনাদেরকে। আপনারা তো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কথা শুনেছেন? আমার তখন চরম দুর্দিন ছিল। আয়ুব খান আমাকে ফাঁসিতে ঝুলানোর জন্য মিথ্যা মামলা দিয়ে ক্যান্টনমেন্টের ক্যাঙ্গারু কোর্টে বিচার করছিল। তখন আমার পরিবার এক বেলা খেত তো আরেক বেলা না খেয়ে থাকত। এই খানে মঞ্চে যে ২২ জন নেতা বসে আছে এরা কেউ সেদিন আমার ও আমার পরিবারের খোঁজ নেই নি। একটি মাত্র ব্যক্তি আমার খোঁজ নিয়েছিল। কাটারিভোগ চাল একবস্তা, আধা বস্তা চিড়া, আখের গুড় নিয়ে ঢাকায় এসে আমার স্ত্রীর সাথে দেখা করেন তিনি। চাল, চিড়া, গুড়সহ বাচ্চাদের খাবার কেনার জন্য তিনি আরও ৫ হাজার টাকা দিয়ে আসেন আমার স্ত্রীর হাতে। এছাড়াও তিনি আমার সাথে জেল গেটে দেখা করে ২কেজি চিড়া, ২কেজি গুড়, এলিনমোড় আমার সিগারেটের মসলা ও ২ হাজার টাকা আমার হাতে দিয়ে আসেন। এখন আপনাদের জানতে ইচ্ছা করছেনা এই লোকটি কে? সবাই চিৎকার দিয়ে বলেন হ্যাঁ জানতে ইচ্ছা করতেছে। যে লোকটি আমার দুর্দিনে উপকার করেছে। আজকে যদি ওই লোকটির প্রতি আমি অবিচার করি তাহলে অন্যায় হবে না? সবাই বলেন হ্যাঁ হবে। তখন বঙ্গবন্ধু বলেন, সেই লোকটি আর কেউ না। এই বৃদ্ধ কমির উদ্দিন মুক্তার। কমির উদ্দিন মুক্তার এর হাত তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু বলেন আমি একেই নমিনেশন দিলাম। এটা শোনে সবাই নিশ্চুপ হয়ে যায়।,

‘বঙ্গবন্ধু আরও বলেন, আমি কর্মীদের সঙ্গে বেঈমানি করতে পারি না। কমির উদ্দিন মুক্তার দূর্দিনে আমার ও আমার পরিবারের খোঁজ নিয়েছে। তোমরা বলতেছো বয়সের কারণে উদ্দিন মুক্তার ঠিকমত ক্যাম্পেইন করতে পারবে না। তার পরেও মঞ্চে বসা ২২ জন নেতাকে আমি নির্দেশ দিয়ে গেলাম। কমির উদ্দিন মুক্তারের আগামী ক্যাম্পেইনে আমি আসবো সেই দিন যেন এই ২২ জনের সবাইকে দেখি আমি। কমির উদ্দিনকে নির্বাচনে জয়ী করতে হবে।,

সেই দিন বঙ্গবন্ধুর সফর সঙ্গী হয়ে বাস্তবে এই চিত্র গুলি দেখেন ও শুনেন বলে স্মৃতিচারণ করে বলেন, ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি-১ বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান বাবলু। তিনি বলেন, এই দৃশ্য দেখে ওইদিন বঙ্গবন্ধুকে মনে মনে স্যালুট জানিয়েছিলেন তিনি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান বাবলু বলেন, ‘এর পর ১৯৭২ সালে হেলিকপ্টার এ করে ঠাকুরগাঁওয়ের সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আসেন বঙ্গবন্ধু। তখনকার দিনে তেমন ফুলের সমারহ ছিলনা। তার পরেও আমার সিনিয়র নেতারা, আমার হাতে ও রহিম মন্ডলের হাতে দুইটি ফুলের মালা দিয়ে বলেন, মালা দুইটি বঙ্গবন্ধুকে পড়িয়ে দিতে। হেলিকপ্টার থেকে নামার পর বঙ্গবন্ধুকে আমরা মালা পড়িয়ে দেই। তার পর তিনি নেতাদের কাছে চলে যান।,

‘যেই সিরাজুল এমপির সামনে মানুষ মাথা তুলে কথা বলতে পারে না। বঙ্গবন্ধু সেই সিরাজুল এমপির কাছে গিয়ে তার মাথার চুল টেনে ধরে বলেন, এই এটা কি রাখছিস তুই? তুই কি গুন্ডা হইছিস? এতবড় চুল কেন? তখন আমরা দেখি লিডারশিপ কাকে বলে ও কত প্রকার। তখন সিরাজ ভাই বঙ্গবন্ধুর কাছে মাথা নত করে থাকেন। বঙ্গবন্ধু সিরাজ ভাইকে বলেন, এখন ১১টা বাজে মিটিং ৩ টায়। আমি যেন দেখি ভদ্রলোকের মতো চুল কেটে সভায় অংশগ্রহণ করতে। নয়তো সভায় অংশগ্রহণ করার দরকার নেই তোমার।,

‘এছাড়াও বঙ্গবন্ধু আমার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে সিরাজ ভাইকে বলেন, তুমি যদি এতবড় চুল রাখো তাহলে বাবলু, রহিম এরা কি করবে? এরা তো গুন্ডা হবে! তখন সিরাজ ভাই নম্রতার সাথে বঙ্গবন্ধুকে বলেন, মনে কিছু নিয়েন না। আপনার আহ্বান যুদ্ধ করতে গিয়ে কখন যে মাথার চুল এতো বড় হয়ে গেছে বুঝতে পারি নি। সেই দিন বঙ্গবন্ধুর কমান্ড/নির্দেশ সিরাজ ভাইয়েরও অমান্য করার ক্ষমতা ছিল না। তিনি বাবুয়া নাপিতকে খুঁজে নিয়ে তার কাছে চুল কেটে নিয়ে আড়াইটার দিকে সভায় অংশগ্রহণ করেন। আর এ দেখে বঙ্গবন্ধু অনেক খুশি হন। ,

বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান বাবলু বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু একবার যদি কারও নাম শোনেন সেটি তিনি অনেক দিন মনে রাখতে পারতেন। ওই যে বলেছিলাম, আমাকে মামা করে ডাকে দুলাল সেন। ১৯৬৯ সালে ঠাকুরগাঁও পুরাতন বলাকা সিনেমা হলে বঙ্গবন্ধুর সাথে দুলাল সেনের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলাম দুলাল সেন আপনার একজন ভক্তমানুষ। তখন কথা হয় বঙ্গবন্ধুর সাথে দুলাল সেনের। বঙ্গবন্ধু দুলাল সেনের কাছে তার পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন। চট্টগ্রামের সূর্য্যসেন বংশধর বলে পরিচয় দেয় বঙ্গবন্ধুকে দুলাল সেন।, ৭০ সালে নির্বাচন হলো, নির্বাচন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল, ৭১ এ ৯মাস ধরে মুক্তিযুদ্ধো পেরিয়ে ৭২ সালের পাকিস্তানের কারাগার থেকে ৮ জানুয়ারি মুক্তি পান বঙ্গবন্ধু। ১০ জানুয়ারি তিনি ঢাকায় পৌঁছান। ৭২ সালের শেষের দিকে আমিসহ কয়েকজন ছাত্রলীগের নেতা বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করতে যাই ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসায়। তখন বঙ্গবন্ধুর সাথে চা নাস্তা খাওয়ার পর। বঙ্গবন্ধু আমাকে বলেন, তোমার ভাগিনা কেমন আছে? আমি একটু অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমার কোন ভাগিনা? বঙ্গবন্ধু বললেন কেন ওই যে সূর্য্যসেনের বংশধর দুলাল সেন কেমন আছে? হ্যাঁ ভালো আছে।,

বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান বাবলু বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর সাথে হ্যান্ডশেক করার ফলে দুলাল তিন দিন ঘুমাতে পারেনি। আর সেই একজন সাধারণ মানুষ দুলালকে ৭২ সালেও মনে রেখে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু এতে আমি অবাক হয়ে যাই।,

বাবলু বলেন, ‘আগে বড় ভাইদের কাছে শুনতাম যে, বঙ্গবন্ধু যেকোন মানুষের নাম একবার শুনলে ও কারও সাথে পরিচয় হলে তা তিনি বহুদিন মনে রাখতে পারতেন। এটি তাঁর বিশেষ গুণ ছিল। সেই দিনের দুলালের ঘটনায় আমি এর বাস্তবতা পেয়েছিলাম। যে সত্যি বঙ্গবন্ধু দীর্ঘদিন পর্যন্ত মানুষের নাম ও পরিচয় মনে রাখতেন। কি ধরণের নেতা হলে সাধারণ মানুষের নাম স্মরণ রাখেন তা আপনারই বুঝে নেন! বঙ্গবন্ধুর সাথে যারা মিশেনি তারা তাঁর সম্পর্কে বলতে পারবে না। ৭৪ সালে যখন বঙ্গবন্ধু সম্মেলনে যান। যেই ফিদেল কাস্ত্রো চেয়ার থেকে ওঠে দাঁড়াতেন না। সেই ফিদেল কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুকে দেখে চেয়ার থেকে ওঠে দাঁড়িয়েছিলেন। ওই দিন ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন, আমি হিমালয় দেখিনি তাতে আমার দুঃখ নেই আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখেছি।,

বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান বাবলু স্মৃতিচারণ করতে করতে আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর হৃদয়টা ছিল হিমালয়ের সমতুল্য। বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ের গভীরতা মাপা আমাদের মতো নেতাদের দূ:সাধ্য। সমুদ্রের তলদেশ মাপা যাবে কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হৃদয় পরিমাপ করা যাবে না। তিনি এমন বড় মাপের নেতা ছিলেন।,

স্মৃতির পাতা থেকে তিনি আরও বলেন, ‘৭২ সালে এক কবি সম্মেলন হয়েছিল জার্মানিতে। আমাদের দেশের একজন নাম করা কবি মহাদেব শাহসহ একটি টিম সেই সম্মেলনে গিয়েছিল। সে সময় বিমান বন্দরে তাদেরকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিল যে আপনারা কোন দেশ থেকে এসেছেন? তখন এই টিমের সদস্যরা বলেছিল বাংলাদেশ থেকে। তখন বাংলাদেশ সবেমাত্র স্বাধীন হয়েছিল। জার্মানিরা তখন বাংলাদেশকে চিনতে না। সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে দুশ্চিন্তায় পরেন মহাদেব। হটাৎ করে মহাদেব তার পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটি ১০ টাকার নোট বের করেন। তখনকার ওই ১০ টাকার নোটে বঙ্গবন্ধুর ছবি ছিল। সেই নোটটি মহাদেব সাংবাদিককে দেখিয়ে বলেন, এই যে আমি তাঁর দেশ থেকে এসেছি। সাংবাদিকরা বঙ্গবন্ধুকে দেখে তাদেরকে অনেক সমাদর করতে থাকেন। এই কথাটি বলার উদ্দেশ্য এই যে, যখন মানুষ বাংলাদেশকে চিনত না তখন বঙ্গবন্ধুকে ঠিকি চিনত। তাহলে কত উঁচুমানের নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু? আর কত বড় নেতা হলে এটা সম্ভব? যখন বাংলাদেশকে বিশ্ব চিনত না তখন বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ব চিনত।,

৭৫ সালে স্বপরিবারসহ বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান বাবলু বলেন, ‘যদি আমি প্রশ্ন করি? কেন এই হত্যা? কি বলবেন? বঙ্গবন্ধুর অপরাধ কি ছিল? তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ, পাথুরিয়া থেকে রুপশা, চাড়োলের মতো ঘুরে বেড়িয়ে বেড়িয়ে এই ঘুমন্ত বাঙালিকে জাগ্রত করেছেন, স্বাধীনতার মূলমন্ত্র পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। এই কি তাঁর অপরাধ ছিল? যে জায়গায় আমাদের বাঙালি হিসেবে জাতিগতভাবে কোন মর্যাদা ছিল না। বঙ্গবন্ধু আমাদের মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন। এই কি তাঁর অপরাধ ছিল? আমাদের নিজেস্ব কোন পতাকা ছিল না। লাল সবুজের পতাকা পতপত করে উড়িয়ে বাঙালি জাতিকে পরিচয় করে দিয়েছে এই তাঁর অপরাধ? আমাদের নিজেস্ব জাতীয় সংগীত ছিলনা। তিনি আমাদের জাতীয় সংগীত এনে দিয়েছেন। এই কি তার অপরাধ ছিল?

‘বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় দেখেছি, যখন জেল থেকে বঙ্গবন্ধু বেড়িয়ে আসেন তখন শেখ হাসিনা আব্বু আব্বু করে বঙ্গবন্ধুর কোলে লাফিয়ে উঠতো। তখন ছোট্ট কামাল বলে হাসু আপা তোমার আব্বুকে আমিও আব্বু বলে ডাকি? কখন এইভাবে একটি বাচ্চা ডাকতে পারে ভাবতে পারেন? যিনি ১৪ বছর জেলে থেকে নিজের যৌবন বাঙালি জাতির জন্য বিলিয়ে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু বাঙালিদের জন্য যতটা সময় পার ও ব্যয় করেছেন ততটা সময় তিনি তাঁর পরিবারকে দিতে পারেন নি। যার জন্য হাসু আপা ও কামালের এই ঘটনার উদ্ভব হয়।,

‘আমরা হাজার বছর ধরে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিলাম। যেই মানুষটি আমাদের স্বাধীনতা এনে দিল। তাঁকে স্বপরিবারে আমরা হত্যা করলাম! যখন বঙ্গবন্ধুকে তোফায়েল আহম্মদসহ কেন্দ্রীয় নেতারা বলছিলেন, যে বঙ্গবন্ধুর এখানে থাকা নিরাপদ নয়। বঙ্গবন্ধু তুমি গণভবনে যাও। তখন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তোমরা কি চাঁদ সওদাগরের ইতিহাস জানোনা? লখিন্দরের জন্য লোহার বাসর ঘর তৈরী করেছিল। কিন্তু লখিন্দর কি বাঁচতে পেরিছিল? পারেনি। ঠিক তোমরা আমাকে গণভবনে কেন যদি লোহার সিন্দুকে রাখ আর মৃত্যু যদি আমার কপালে থাকে তাহলে কেউ থামায় রাখতে পারবে না। তবে আমরা বিশ্বাস আয়ুব খান, টিক্কা খান, ইয়াহিয়া খান, নিয়াজি, পিয়াজি কেউ আমাকে হত্যা করতে পারেনি। আর আমি বাঙালিদের ভয়ে গণভবনে যাবো? কেউ যদি আমাকে হত্যা করে করবে।,

‘বাঙালিদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর যে একটা অগাত বিশ্বাস ছিল। যে বাঙালিরা তাঁকে মারতে পারেনা। যখন বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের জেলে ছিলেন, তখন তাঁকে কবর খুরে দেখানো হয়েছিল ও বলা হয়েছিল যে, এই কবরটি কার জন্য? বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এটি আমার জন্য খুরা হয়েছে। তবে শেখ মুজিব তোমাদের কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইবে না। আমাকে যদি তোমরা সত্যি সত্যি মেরে ফেলো তাহলে আমার একটাই অনুরোধ তোমাদের কাছে, আমার লাশটা এখানে কবর দিও না। আমার লাশটি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিও। কারণ বাঙালিরা আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসে।,

‘বঙ্গবন্ধুর যে বিশ্বাস বাঙালিদের প্রতি ছিল সেই বিশ্বাস কি আমরা ধরে রাখতে পেরেছি? আমরা পক্ষান্তরে কি বলতে পারি না, আমরা অকৃতজ্ঞ জাতি? যেই মানুষটি জীবনের যৌবন বিলিয়ে দিয়ে স্বাধীনতা উপহার দিয়ে গেল। আর তাঁকে আমরা স্বপরিবারে হত্যা করেছি। তাঁকে রক্ষা করতে পারিনি। এটা ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। শুধু সময় কাল তফাৎ ১৭৫৭ খ্রিস্টাবে পলাশীর প্রান্তরে মিরজাফরের মিজাফরির কারণে নবাব সিরাজ উদ্দোলার পতন হলো। সেদিন স্বাধীনতার সূর্যাস্ত অস্তমিত গিয়েছিল। খন্দকার মোশতাক এর বেঈমানিতে মিরজাফরির কারণে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করা হলো। পরে খন্দকার মোশতাক এর পরিণতি কি হয়েছিল তা কারও অজানা নয়। ইতিহাস থেকে কেউ যদি শিক্ষা না নেয়। ইতিহাস রাস্তা খুরে নিক্ষেপিত হবেই। ইতিহাস বড় নির্মম। ইতিহাস অনন্তকাল ধরে চলবে ও সত্য কথাটি তুলে ধরবে। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না।,

“ইতিহাসের কাছ থেকে নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে এ দেশকে, মাতৃভূমিকে ভালোবাসতে বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান বাবলু। তাহলে সবাই ভালো থাকতে পারবো বলে মন্তব্য করেন তিনি। এছাড়াও তিনি বলেন, আমরা স্বাধীনতা এনেছি। স্বাধীনতা রক্ষা করার দায়িত্ব নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের।,,

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
বিষয়: * বঙ্গবন্ধু * স্বাধীনতা
লাইভ রেডিও
সর্বশেষ সংবাদ