পঁচন ধরে খসে খসে পড়ছে মাংস, টাকার অভাবে হচ্ছেনা চিকিৎসা!

 

শুভ কুমার ঘোষ, সিরাজগঞ্জ:

সিরাজগঞ্জে এক বৃদ্ধার পায়ে পঁচন ধরে পা থেকে মাংস খসে খসে পড়লেও টাকার অভাবে চিকিৎসা করতে পারছেন না তার অসহায় পরিবার। চিকিৎসক বলছেন পায়ের রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যাবায় এমনটা হচ্ছে, উন্নত চিকিৎসার জন্য নিতে হবে ঢাকায়। কিন্তু পরিবারের অসহায়ত্বের কারণে বিছানাতেই যেন মৃত্যুর প্রহর গুনছেন তিনি। নিরুপায় হয়েই জনসাধারণের কাছে মা’কে বাঁচানোর আবেদন জানিয়েছে তার সন্তানেরা।

 

অসুস্থ বৃদ্ধা মোছা. আমিনা খাতুন (৬৯) সিরাজগঞ্জ পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের সয়াধানগড়া মহল্লার মৃত ফয়েজ আহমেদের স্ত্রী। বর্তমানে তিনি একই এলাকায় ছোটছেলে সুমন আহমেদ এর সঙ্গে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করেন।

 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ ঘরের একটি ইলেকট্রনিক বেডে ছবির মত শুয়ে আছেন তিনি। পারেন না ঠিকমত নড়াচড়া করতেও, দুইটি স্ট্রোক হয়ে হারিয়েছেন স্মৃতি সহ মুখের ভাষাও। চোখ ভরা কথা থাকলেও তিনি যেন নির্বাক। ডান পায়ের হাটু থেকে পায়ের তালু পর্যন্ত করা ব্যান্ডেজ। তার উপর দিয়ে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে অসংখ্য মাছি, বের হচ্ছে দুর্গন্ধ। বেশিরভাগ মানুষই এ দুর্গন্ধের জন্য কাছে যেতে চায় না। অসংখ্য অনুভূতি নিয়ে নির্বাক হয়ে শুয়ে আছেন তিনি।

 

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, দুই ছেলে ও এক মেয়ে সহ তিন সন্তানের জননী বৃদ্ধা আমিনা। স্বামী মারা গেছেন বেশ কিছু বছর আগে। ছেলে মেয়েদের সংসারেও যেন নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। বড় ছেলেটা কনস্ট্রাকশন সাইটে কাজ করে কোনরকমে নিজ সংসার চালান। ছোট ছেলেটা করেন রং তুলির কাজ। সেটাও যেন করোনায় থাবায় আর আধুনিকতার ছোয়ায় হারিয়ে গেছে। তবুও চেষ্টা করে জাচ্ছেন মা’কে বঁাচিয়ে রাখতে।

 

বৃদ্ধার ছোট ছেলে মো. সুমন আহমেদ বলেন, আমরা দুই ভাই এক বোন। বড় ভাই আনোয়ার হোসেন ইন্সট্রাকশন সাইটে কাজ করেন। বোন গৃহিণী। আর আমার হাতেও এখন কোন কাজ নেই। নিজের সংসারই ঠিক মতো চলেনা।

 

তিনি তার মার অসুস্থতার বিবরণ দিত গিয়ে বলেন, ২০২১ সালের জুন মাসে মা প্রথমে ব্রেইন স্ট্রোক করেন। পরবর্তীতে নভেম্বরে আবারও স্ট্রোক করেন তিনি। এরপর ২০২২ এর ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে তার পায়ের রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় মাস খানিক সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাও করিয়েছি কিন্তু তেমন কোনও লাভ হয়নি। এখানে চিকিৎসা নেওয়া হলে ঢাকা যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক।

 

তিনি বলেন, এখন পায়ের হাটুর নিচের অংশ থেকে মাংস পঁচে খুলে খুলে পড়ছে। মাংস খুলে পড়ে পায়ের পাতাও বের হয়ে গিয়েছে কয়েকদিন আগে। এখন যেকোনো মুহূর্তে পায়ের পাতাটিও আলাদা হয়ে যাবে। প্রতিদিন পায়ের ড্রেসিং করাতে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, প্রথমে নার্স নিয়ে পরিষ্কার (ড্রেসিং) করাতাম কিন্তু পায়ের পঁচা মাংসের গন্ধে তেমন কেও আসতে চায়না। আবার কেও আসতে চাইলেও অনেক বেশি টাকা চায় তাই টাকার অভাবে সেটাও করতে পারছি না। এখন নিজেই পরিষ্কার (ড্রেসিং) করি। চিকিৎসক বলেছেন এখন পা কেটে ফেলতে হবে না হলে মাকে আর বাচানো যাবেনা। কিন্তু সেটা করতে গেলেও লাখ টাকার ওপরে দরকার, টাকার অভাবে সেটাও করতে পারছিনা।

 

তিনি আরও বলেন, টাকার জন্য চিকিৎসা করাতে পারছিনা মর্মে আর্থিক অনুদান চেয়ে সমাজ সেবা কার্যালয়ে আবেদন দেওয়া হয়েছে। সেখানেও সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন কতৃপক্ষ। তাই আমার মা’কে বঁাচাতে সমাজের উচ্চবিত্তদের কাছে সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছি।

 

বর্তমান ভাড়া বাসার মালিক মো. সুমন বলেন, আমরা দেখছি তাদের এই কষ্টের অবস্থা। সুমন ও তার স্ত্রী দুজনেই খুব অসুস্থের সেবা যত্ন করলেও টাকার অভাবে তেমন কিছু করতে পারছেনা। তাদের এই অবস্থা দেখে আমি নিজেও তাদের মাসে ভাড়া নেইনি। আমি সবাইকে আহ্ববান জানাবো এই অসুস্থ মানুষটির পাশে দাড়াতে।

 

দ্য বার্ড সেফটি হাউসের চেয়ারম্যান পরিবেশ ও সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাস বলেন, এমন চিকিৎসার জন্য অনেক সাহায্যের অনেক আবেদন রয়েছে। আমি ব্যাক্তিগতভাবে তার চিকিৎসার জন্য ৫হাজার টাকা দিয়েছি। আমি চেষ্টা করবো তার জন্য আরও কিছু করতে পারি কিনা।

 

সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সুখ পাখি সিরাজগঞ্জ এর পরিচালক সেখ রজব বলেন, বিষয়টি জানার পরে আমাদের মাসিক ডোনার থেকে পাওয়া টাকা থেকে আজ তাকে ৫হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি তাকে আরও কিছু সহায়তা দেওয়া যায় কিনা।

 

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা বলেন, এগুলো একটু সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। তারপরও আমি চেষ্টা করবো তাদের জন্য কিছু করার এবং যতটা তারাতাড়ি করা সম্ভব হয়।

 

সিরাজগঞ্জ সমাজ সেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক (ডিডি) মো. মতিউর রহমান বলেন, বিষয়টি আমি আপনার মাধ্যমেই জানলাম। আমি বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে যতটা দ্রুত সম্ভব তাদেরকে সহায়তা করবো। এছাড়াও আমি চেষ্টা করবো আমার অধিদপ্তরের বাইরেও কোনভাবে তাকে সহযোগিতা করা যায় কিনা।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
বিষয়: * চিকিৎসা
লাইভ রেডিও
সর্বশেষ সংবাদ