সারাদেশে ৫৩৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৬,২৮৪ জন ও আহত ৭,৪৬৮ জন

 

 

 

সৈয়দ আমিরুজ্জামান, বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাকা, ০৮ জানুয়ারি ২০২২ : বিদায়ী ২০২১ সালে সারাদেশে ৫৩৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৬,২৮৪ জন ও আহত ৭,৪৬৮ জন হয়েছেন বলে এক গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশ।

নিহতের মধ্যে নারী ৯২৭, শিশু ৭৩৪। ২০৭৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২২১৪ জন, যা মোট নিহতের ৩৫.২৩ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩৮.৬৮ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ১৫২৩ জন পথচারী নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ২৪.২৩ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৭৯৮ জন, অর্থাৎ ১২.৬৯ শতাংশ।

আজ শনিবার (৮ জানুয়ারি ২০২২) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘২০২১ সালের সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ ও পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

তাতে সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সংগঠনের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বুয়েট এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোঃ হাদিউজ্জামান, রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ও ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান সিদ্দিকী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, বারভিডা সাবেক প্রেসিডেন্ট ও গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ আব্দুল হামিদ শরীফ, রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক হাসিনা বেগম, বুয়েট এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. আরমানা সাবিহা হক।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই সময়ে ৭৬টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৫৯ জন নিহত, ১৯২ জন আহত এবং ৪৭ জন নিখোঁজ রয়েছে। ঝালকাঠির সুগন্ধ্যা নদীতে ১টি লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ৫১ জন নিহত, ২৩ জন চিকিৎসাধীন এবং অজ্ঞাত সংখ্যক নিখোঁজ রয়েছে। এছাড়ার ঈদে ঘরমখো যাত্রায় শিমুলিয়া-বাংলাবাজার ফেরি ঘাটে তাড়াহুড়া করে নামার সময় ৬ জন নিহত এবং ৩১ জন আহত হয়েছে।  ১২৩ টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ১৪৭ জন নিহত এবং ৩৯ জন আহত হয়েছে।

 

 

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৭টি জাতীয় দৈনিক, ৫টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেক্টনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

 

দুর্ঘটনার যানবাহনভিত্তিক নিহতের চিত্র:

 

দুর্ঘটনায় যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়- মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ২২১৪ জন (৩৫.২৩%), বাস যাত্রী ৩৮৯ জন (৬.১৯%), ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ডভ্যান-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি যাত্রী ৪৫৭ জন (৭.২৭%), মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-এ্যাম্বুলেন্স-জীপ যাত্রী ২৭৬ জন (৪.৩৯%), থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-মিশুক-টেম্পু-লেগুনা) ৯৩৪ জন (১৪.৮৬%), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-পাখিভ্যান-চান্দের গাড়ি-বোরাক-মাহিন্দ্র-টমটম) ৩৫৯ জন (৫.৭১%) এবং বাইসাইকেল-প্যাডেল রিকশা-রিকশাভ্যান-ঠ্যালাগাড়ি আরোহী ১৩২ জন (২.১০%) নিহত হয়েছে।

 

দুর্ঘটনা সংঘটিত সড়কের ধরন:

 

 

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ২০১৪ টি (৩৮.৪৯%) জাতীয় মহাসড়কে, ১৬৭০ টি (৩১.০৯%) আঞ্চলিক সড়কে, ৯৫৪ টি (১৭.৭৬%) গ্রামীণ সড়কে, ৬৬৫ টি (১২.৩৮%) শহরের সড়কে এবং অন্যান্য স্থানে ৬৮ টি (১.২৬%) সংঘটিত হয়েছে।

 

দুর্ঘটনার ধরন:

 

দুর্ঘটনাসমূহের ১০৫৭ টি (১৯.৬৭%) মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৮১৩ টি (৩৩.৭৫%) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১৫৬৬ টি (২৯.১৫%) পথচারীকে চাপা/ধাক্কা দেয়া, ৮২২ টি (১৫.৩০%) যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ১১৩ টি (২.১০%) অন্যান্য কারণে ঘটেছে।

 

 

দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহন:

 

দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের মধ্যে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-কন্টেইনার ২৪.৮২ শতাংশ, ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি-ড্রাম ট্রাক- তেলবাহী ট্যাংকার- লং ভেহিকেল ৫.০৮ শতাংশ, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-এ্যাম্বুলেন্স-পুলিশ পিকআপ-জীপ ৫.৪৩ শতাংশ, যাত্রীবাহী বাস ৯.৭৭ শতাংশ, মোটরসাইকেল ২৫.৬০ শতাংশ, থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-মিশুক-লেগুনা-টেম্পু) ১৮.১৯ শতাংশ, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন (নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-পাখিভ্যান-মাহিন্দ্র-টমটম-চান্দের গাড়ি-মেসিগাড়ি-আলগানন) ৮.৩১ শতাংশ, বাইসাইকেল-প্যাডেল রিকশা-রিকশাভ্যান ২.১৭ শতাংশ এবং অন্যান্য মোটরযান ০.৫৮ শতাংশ (কোস্ট গার্ডের ট্রাক, রেকার, ডিসিসি’র ময়লাবাহী ট্রাক, হ্যান্ড ট্রলি, ডাম্পার, পাওয়ারটিলার, মাটি কাটার ট্রাক্টর, ইটভাঙ্গার মেশিন গাড়ি, রোড রুলার, রোড কাটার মেশিন, নির্মাণ সামগ্রীর মিকচার মেশিন)।

 

দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা:

দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা ৮৩১৫টি। (ট্রাক ১৪২৬, বাস ৮১৩, কাভার্ডভ্যান ২৫৪, পিকআপ ৩৭৯,  ট্রলি ১৬৭, লরি ৮৩, ট্রাক্টর ১৩২, মাইক্রোবাস ১৯৭, প্রাইভেটকার ১৫৫, এ্যাম্বুলেন্স ৬৬, জীপ ১৮, মোটরসাইকেল ২১২৯, পুলিশ ও র‌্যাবের পিকআপ ১৬, ড্রাম ট্রাক ২৪, তেলবাহী ট্যাংকার ১৩, লং ভেহিকেল ৪, কন্টেইনার ৫, থ্রি-হুইলার ১৫১৩ (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-মিশুক-লেগুনা-টেম্পু), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন ৬৯১ (নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু- পাখিভ্যান- বোরাক-মাহিন্দ্র-টমটম-চান্দের গাড়ি- মেসিগাড়ি- আলগানন), বাইসাইকেল- প্যাডেল রিকশা-রিকশাভ্যান-ঠ্যালাগাড়ি ১৮১ এবং অন্যান্য মোটরযান ৪৯টি (কোস্টগার্ডের ট্রাক ২, রেকার ৪, ডিসিসি’র ময়লাবাহী ট্রাক ৫, হ্যান্ডট্রলি ৩, ডাম্পার ৭, পাওয়ারটিলার ৯, মাটি কাটার ট্রাক্টর ৩, ইটভাঙ্গার মেশিন গাড়ি ৪, রোড রুলার গাড়ি ৩, রোড কাটার মেশিন গাড়ি ২, নির্মাণ সামগ্রীর মিকচার মেশিন গাড়ি ৩ টি)।

 

দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ:

 

সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনাসমূহ ঘটেছে ভোরে ৩১৫টি (৫.৮৬%), সকালে ১৬৪১টি (৩০.৫৫%), দুপুরে ৯৩৬টি (১৭.৪২%), বিকালে ১০০৫টি (১৮.৭১%), সন্ধ্যায় ৪৮৯টি (৯.১০%) এবং রাতে ৯৮৫টি (১৮.৩৩%)।

 

দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান:

 

 

 

দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা ২৫.০২%, প্রাণহানি ২৪.৫৮%, রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ১৪.৪২%, প্রাণহানি ১৪.৭৩%, চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ১৭.৮৫%, প্রাণহানি ১৮.২৬%, খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা  ১০.৫০%, প্রাণহানি ১০.৬৩%, বরিশাল বিভাগে দুর্ঘটনা ৯.৭৫%, প্রাণহানি ৯.৩৪%, সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ৭.২৭%, প্রাণহানি ৭.৭২%, রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা ৭.৪১%, প্রাণহানি ৭.০৪% এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনা ৭.৭৪%, প্রাণহানি ৮.১৬% ঘটেছে।

 

ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ১৩৪৪ টি দুর্ঘটনায় নিহত ১৫৪৫ জন। সবচেয়ে কম রংপুর বিভাগে। ৩৯৮ টি দুর্ঘটনায় নিহত ৪৪৩ জন।

 

রেল ক্রসিং দুর্ঘটনা:

 

সারা দেশে ৮২ শতাংশ রেল ক্রসিং অরক্ষিত। এসব রেল ক্রসিংয়ে গত বছরে ৩৩ টি দুর্ঘটনায় ৭৪ জন নিহত হয়েছে।

 

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, নিহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্য ৬১ জন, সেনা সদস্য ৮ জন, বিমান বাহিনী সদস্য ২ জন, এপিবিএন সদস্য ১ জন, র‌্যাব সদস্য ৪ জন, বিজিবি সদস্য ৩ জন, আনসার সদস্য ৪ জন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক ৪ জন, জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ১ জন, স্কুল-কলেজ-মাদরাসার শিক্ষক ১৪৯ জন, চিকিৎসক ২৭ জন, স্বাস্থ্যকর্মী ১১ জন, প্রকৌশলী ১৭ জন, আইনজীবী ২৩ জন, সাংবাদিক ৫১ জন, ব্যাংক কর্মকর্তাা ৩৮ জন, এনজিও কর্মকর্তা-কর্মচারী ১২৯ জন, একাত্তর টিভির ভিডিও এডিটর ১ জন, বাসসের টেলিফোন অপারেটর ১ জন, জেলা ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ১ জন, পোশাক শ্রমিক ৯৩ জন, নির্মাণ শ্রমিক ৩৭ জন, ইটভাটা শ্রমিক ৪৬ জন, কৃষি শ্রমিক ৪৩ জন, মাটি কাটা শ্রমিক ১৩ জন, রাজমিস্ত্রি ১৭ জন, কাঠমিস্ত্রি ১১ জন, চাতাল শ্রমিক ৭ জন, জুতা কারখানার শ্রমিক ১৪ জন, বালু শ্রমিক ৭ জন, রেল শ্রমিক ৫ জন, প্রবাসী শ্রমিক ১৩ জন, পাটকল শ্রমিক নেতা ১ জন, রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শ্রমিক-কর্মকর্তা-প্রকৌশলী ৮ জন, পল্লী বিদ্যুতের শ্রমিক-কর্মকর্তা ৭ জন, মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ৪২ জন, ঔষধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রয় প্রতিনিধি ২৫৪ জন, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ৪৭২ জন, যুক্তরাজ্য, ইরান ও আমিরাত প্রবাসী ৯ জন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ১৫৬ জন এবং দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৮০৩ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।

 

 

সড়ক দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা:

 

২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে দুর্ঘটনা বেড়েছে ০.৮৯ শতাংশ, প্রাণহানি বেড়েছে ৪.২২ শতাংশ এবং আহত বেড়েছে ৩.৮৮ শতাংশ। আবার ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৩.৪৩ শতাংশ, প্রাণহানি বেড়েছে ১৫.৭০ শতাংশ এবং আহত বেড়েছে ১.২০ শতাংশ।

 

বছর দুর্ঘটনা নিহত আহত

 

২০১৯ ৪৬৯৩ টি ৫২১১ জন ৭১০৩ জন

 

২০২০ ৪৭৩৫ টি ৫৪৩১ জন ৭৩৭৯ জন

 

২০২১ ৫৩৭১ টি ৬২৮৪ জন ৭৪৬৮ জন

 

উল্লেখ্য ২০১৯, ২০২০ এবং ২০২১- এই তিন বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ছাড়া অন্যান্য দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় সমান। খুব বেশি কম-বেশি হয়নি। মূলত ক্রমবর্ধমান মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির কারণেই ২০২০ এবং ২০২১ সালের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির মোট সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার তুলনামূলক চিত্র:

 

বছর দুর্ঘটনা নিহত

 

২০১৯ ১১৮৯ টি ৯৪৫ জন

 

২০২০ ১৩৮১ টি ১৪৬৩ জন

 

২০২১ ২০৭৮ টি ২২১৪ জন

 

২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৬.১৪ শতাংশ এবং প্রাণহানি বেড়েছে ৫৪.৮১ শতাংশ। ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে ৫০.৪৭ শতাংশ এবং প্রাণহানি বেড়েছে ৫১.৩৩ শতাংশ।

 

২০২১ সালের মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার বিশ্লেষণ:

 

২০২১ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে ২০৭৮ টি, নিহত হয়েছে ২২১৪ জন, আহত ১৩০৯ জন। নিহতের মধ্যে ৭৪.৩৯ শতাংশ ১৪ থেকে ৪৫ বছর বয়সী।

 

অন্য যানবাহনের সাথে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটেছে ২১.১২%, মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩৫.২৭%, মোটরসাইকেলে ভারী যানবাহনের চাপা ও ধাক্কা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে ৪৩.০৭% এবং অন্যান্য কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে ০.৫২%।

 

৪০.৭৬% দুর্ঘটনার জন্য মোটরসাইকেল চালক এককভাবে দায়ী ছিল। দুর্ঘটনার জন্য বাসের চালক দায়ী ১০.২৫%, ট্রাক চালক দায়ী ২৮.০৫%, কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি-ট্যাংকার চালক দায়ী ৯%, প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস চালক দায়ী ২.৫৫%, থ্রি-হুইলার ৫.৫৮%, বাইসাইকেল, প্যাডেল রিকশা, রিকশাভ্যান চালক দায়ী ০.৫৭% এবং পথচারী দায়ী ৩.২২%।

 

৩৪.৫০% মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে, ৩১.৬৬% ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে, ১৮.৩৩% ঘটেছে গ্রামীণ সড়কে এবং ১৫.৪৯% দুর্ঘটনা ঘটেছে শহরের সড়কে।

 

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বৃদ্ধির পেছনে অনেকগুলো কারণ কাজ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, মোটরসাইকেল চালকদের বিরাট অংশ কিশোর ও যুবক। এদের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা এবং না মানার বিষয়টি প্রবল। কিশোর-যুবকরা বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালিয়ে নিজেরা দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং অন্যদেরকে আক্রান্ত করছে।

 

দেশে দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় মোটসাইকেল সংস্কৃতি চরমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব মোটসাইকেল চালক সড়ক-মহাসড়কে বেপরোয়াভাবে চলাচল করছে। এদের বেপরোয়া মোটরসাইকেলের ধাক্কায় পথচারী নিহতের ঘটনাও বাড়ছে।

 

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার একটি ব্যাপক অংশ ঘটছে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ ও বাসের ধাক্কা, চাপা এবং মুখোমুখি সংঘর্ষে। এসব দ্রæত গতির যানবাহনের চালকদের অধিকাংশই অদক্ষ ও অসুস্থ। তাদের বেপরোয়াভাবে যানবাহন চালানোর ফলে যারা সাবধানে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন তারাও দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।

 

মোটরসাইকেল ৪ চাকার যানবাহনের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু দেশে গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত ও সহজলভ্য না হওয়া এবং যানজটের কারণে মানুষ মোটরসাইকেল ব্যবহারে উৎসাহিত হচ্ছে এবং দুর্ঘটনা বাড়ছে।

 

পথচারী নিহতের দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ:

 

২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫২৩ জন পথচারী নিহত হয়েছে। রাস্তায় হাঁটার সময় দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫৩.৫১ শতাংশ এবং রাস্তা পারাপারের সময় ঘটেছে ৪৬.৪৮ শতাংশ। ৬১.৮০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে যানবাহনের বেপরোয়া গতির কারণে এবং ৩৮.১৯ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে পথচারীদের অসতর্কতার কারণে।

 

পথচারী নিহতের ঘটনা মহাসড়কে ৩০.৯০%, আঞ্চলিক সড়কে ২৩.৮৬%, গ্রামীণ সড়কে ২৯.৮৯%, শহরের সড়কে ১৪.৩২% এবং অন্যান্য স্থানে ঘটেছে  ১%।

 

দুর্ঘটনায় পথচারী নিহতের ঘটনা ভোরে ৩%, সকালে ২৮.৩৯%, দুপুরে ২০.১০%, বিকালে ২২.১১%, সন্ধ্যায় ১১.৫৫% এবং রাতে ১৪.৮২% ঘটেছে।

 

যানবাহনের অতিরিক্ত গতি, সড়কের সাইন-মার্কিং-জেব্রা ক্রসিং চালক এবং পথচারীদের না মানার প্রবণতা, যথাস্থানে সঠিকভাবে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ না করা এবং ব্যবহার উপযোগী না থাকা, রাস্তায় হাঁটা ও পারাপারের সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা, হেডফোনে গান শোনা, চ্যাটিং করা এবং সড়ক ঘেঁষে বসতবাড়ি নির্মাণ ও সড়কের উপরে হাট-বাজার গড়ে উঠা ইত্যাদি কারণে পথচারী নিহতের ঘটনা বাড়ছে।

 

রাজধানীর সড়ক দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ:

 

রাজধানীতে ১৩১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ১৩৭ জন। নিহতদের মধ্যে পথচারী ৫২.৫৫%, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ২৮.৪৬% এবং বাস-রেকার-প্যাডেল রিকশা-রিকশাভ্যান-অটোভ্যান, ঠ্যালাগাড়ি ইত্যাদির যাত্রী ও আরোহী ১৮.৯৭%।

 

রাজধানীতে যানবাহনের চাপায়-ধাক্কায় পথচারী বেশি হতাহত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনা রাতে এবং ভোরে বেশি ঘটেছে।  বাইপাস রোড না থাকার কারণে রাত ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত রাজধানীতে মালবাহী ভারী যানবাহন বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। ফলে রাস্তা পারাপারে পথচারীরা নিহত হচ্ছে। এছাড়া দীর্ঘ সময় যানজটের কারণে যানবাহন চালকদের আচরণে অসহিষ্ণুতা ও ধৈর্য্যহানি ঘটছে, যা সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে কাজ করছে। ফলে সকালে কর্মস্থলে যাবার সময় বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। রাজধানীতে দুর্ঘটনার সময়চিত্র দেখলে বিষয়টি বুঝা যাবে। ভোরে ২০.৬১%, সকালে ১৮.৩২%, দুপুরে ৯.১৬%, বিকালে ১২.৯৭%, সন্ধ্যায় ৩.৮১% এবং রাতে ৩৫.১১% দুর্ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীতে যানবাহনের তুলনায় অপ্রতুল সড়ক, একই সড়কে যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক, স্বল্প ও দ্রæত গতির যানবাহনের চলাচল, ফুটপাত হকারের দখলে থাকা, ফুটওভার ব্রিজ যথাস্থানে নির্মাণ না হওয়া ও ব্যবহার উপযোগী না থাকা এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে অসচেতনতার কারণে অতিমাত্রায় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটছে।

 

সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণসমূহ:

 

১. ত্রæটিপূর্ণ যানবাহন; ২. বেপরোয়া গতি; ৩. চালকদের অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা; ৪. বেতন-কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট না থাকা; ৫. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল; ৬. তরুণ-যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো; ৭. জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা; ৮. দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা; ৯. বিআরটিএ’র সক্ষমতার ঘাটতি; ১০. গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।

সুপারিশসমূহ:

 

১. দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি করতে হবে; ২. চালকদের বেতন-কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করতে হবে; ৩. বিআরটিএ’র সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে; ৪. পরিবহন মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে; ৫. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন বন্ধ করে এগুলোর জন্য আলাদা রাস্তা (সার্ভিস লেন) তৈরি করতে হবে; ৬. পর্যায়ক্রমে সকল মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করতে হবে; ৭. গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে; ৮. রেল ও নৌ-পথ সংস্কার করে সড়ক পথের উপর চাপ কমাতে হবে; ৯. টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন করতে হবে; ১০. “সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮” বাধাহীনভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

 

দেশে যথেষ্ট উন্নত সড়ক অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। এতে যানবাহনের গতি বেড়েছে। কিন্তু গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাব বা প্রযুক্তি ব্যবহারে অনিচ্ছার কারণে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ছে।

 

২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় যে পরিমান মানব সম্পদের ক্ষতি হয়েছে তার আর্থিক মূল্য ৯ হাজার ৬ শত ৩১ কোটি টাকা, যা জিডিপি’র দশমিক ৩ শতাংশ। রজঅচ (ওহঃবৎহধঃরড়হধষ জড়ধফ অংংবংংসবহঃ)  এর সবঃযড়ফ অনুযায়ী হিসাবটি করা হয়েছে। দুর্ঘটনায় যে পরিমান যানবাহন বা প্রপার্টি ড্যামেজ হয়েছে তার তথ্য না পাওয়ার কারণে প্রপার্টি ড্যামেজের আর্থিক পরিমাপ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। উল্লেখ্য, দুর্ঘটনার অনেক তথ্য আন্ডার রিপোর্টেড থাকে। ধারণা করা হয়, গণমাধ্যমে যে পরিমাণ তথ্য প্রকাশিত হয়, প্রকৃত তথ্য তার চেয়ে ৪/৫ গুণ বেশি। এই হিসেবে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আমাদের জিডিপির প্রায় ১.৫ শতাংশ হতে পারে।

 

২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষ নিহত হয়েছেন ৫১৯২ জন, অর্থাৎ ৮২.৬২%।

 

রাজধানীতে রুট ফ্রাঞ্চাইজ পদ্ধতির মাধ্যমে কোম্পানীভিত্তিক যাত্রীবান্ধব গণপরিবহন চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে। রাজধানীর পুরাতন মেয়াদোত্তীর্ণ বাস প্রত্যাহার করে ৪ হাজার নতুন বাস দ্বারা এই সার্ভিস চালু করার কথা ছিল। এটি সম্ভব হলে রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হতো। কিন্তু পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের আপত্তি ও অসহযোগিতার কারণে সম্ভব হয়নি। তবে  গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর থেকে রাজধানীর মাত্র একটি রুটে ৫০টি পুরাতন বাস দ্বারা খুবই অপরিকল্পিত ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে “নগর গণপরিবহন” নামে একটি বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। এই সার্ভিস যাত্রী সাধারণের মধ্যে তেমন প্রভাব ফেলতে পারছে না। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই এটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আমাদের আশংকা।

 

উল্লেখ্য, রাজধানীতে যানজট কমানো এবং যাতায়াতের সুবিধার জন্য সরকার একটি মেট্রোরেল এবং ২টি সাবওয়ে নির্মাণের জন্য প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে মেট্রোরেল নির্মাণ সমাপ্তির পথে। সাবওয়ে দু’টির নির্মাণ কাজও শীঘ্রই শুরু হবে। কথা হলো, ১ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের মাধ্যমে যে পরিমাণ যাত্রী বহন করা যাবে তার চেয়ে সাড়ে ৩ গুণ বেশি যাত্রী বহন করতে হবে বাস সার্ভিসের মাধ্যমে। এই খাতে মাত্র ৫ হাজার কোটি টাকার নতুন বাস ক্রয় করে দুর্নীতিমুক্ত, সুষ্ঠু ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালনা করতে পারলে ঢাকার গণপরিবহন সেবার মান বদলে যাবে। কিন্তু সরকার এটা করছে না। সরকার বেসরকারি বাস মালিকদের ব্যবসায়িক সুবিধা দেখছে, সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুবিধার কথা ভাবছে না। বস্তত রাজধানীর গণপরিবহনে নৈরাজ্য বন্ধের কোনো কার্যকর উদ্যোগ আপাতত দৃশ্যমান নয়।

 

গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা প্রতিষ্ঠান ইজঞঅ, ইজঞঈ, উঞঈঅ- এর শীর্ষ পদে যাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয় তাঁদের  গণপরিবহন বিষয়ে কোনো প্র্যাক্টিক্যাল এবং একাডেমিক জ্ঞান থাকে না। নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে তাঁরা কিছুদিন রুটিন কাজ করেন, তারপর অন্যত্র বদলি হয়ে যান কিংবা অবসরে যান। ফলে এসব জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় কোনো উন্নতি হয় না। আমরা মনে করি, সড়ক ও গণপরিবহন পরিচালনা বিষয়ে যাঁদের একাডেমিক পড়ালেখা আছে, গবেষণা আছে, দেশে-বিদেশে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে- এমন ব্যক্তিদের এসব প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া উচিত। একইসাথে তাঁদের কাজের সুবিধার জন্য যথেষ্ট সংখ্যক প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ সহযোগী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। একটি ব্যাংক পরিচালনার জন্য যদি ১৫/২০ লাখ টাকা বেতনে অভিজ্ঞ ঈঊঙ নিয়োগ দেওয়া যায়, তাহলে ইজঞঅ, ইজঞঈ, উঞঈঅ পরিচালনায় উচ্চ বেতনে বিশ^মানের অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া যাবে না কেন? যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির সাথে তো দেশের আর্থিক অগ্রগতির বিষয়টি নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।

 

সারা দেশের গ্রামে-গঞ্জে সড়ক অবকাঠামো গড়ে উঠলেও আধুনিক নিরাপদ যানবাহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে মানুষের প্রয়োজনের তাগিদেই ইজিবাইক, অটোরিকশা, অটোভ্যানের মতো থ্রি-হুইলার জাতীয় যানবাহনের প্রচলন ঘটেছে। মাননীয় হাইকোর্ট দেশব্যাপী চলাচলকারী ৪০ লাখ থ্রি-হুইলার বন্ধের যে রায় দিয়েছেন, তা বাস্তবায়ন হলে প্রায় ৫০ লাখ থ্রি-হুইলার চালক কর্মহীন হয়ে পড়বে। বিপুল অর্থের বিনিয়োগ হুমকিতে পড়বে। এসব যানবাহন সংযোজন ও মেরামত কেন্দ্রিক যে ব্যবসা ও কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে তা বন্ধ হয়ে যাবে। গ্রাম ও মফস্বল শহরে স্বল্প দূরত্বে চলাচলকারী মানুষের যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়বে। সবমিলে আর্থ-সামাজিক সংকট তৈরি হবে। তাই আমরা মনে করি, এসব যানবাহন নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে, চালকদের স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং যানবাহনের নিরাপত্তা বিষয়ক যান্ত্রিক উন্নয়ন করতে হবে। এতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে, দুর্ঘটনা কমবে। একইসাথে এ ধরনের যানবাহন চলাচলের জন্য নতুন করে রোড ডিজাইন করতে হবে। টেকসই বিকল্প ব্যবস্থা না করে কোনোভাবেই থ্রি-হুইলার বন্ধ করা উচিত হবে না।

 

 

 

সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকাংশই হতদরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। ক্ষতিগ্রস্তদের ৭২-৭৫ শতাংশই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত-নিহতরা তাদের পরিবারের প্রধান বা একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ফলে এসব পরিবার আর্থিকভাবে বিপন্ন হয়ে পড়ছে। একেবারে মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। সামাজিক অর্থনীতির মূল ¯্রােত থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ সরকার সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদান বা পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করছে না। ১৯৮৩ সালের “মোটরযান অধ্যাদেশ এ্যাক্ট”- এ সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মোটরযানে তৃতীয় পক্ষীয় ঝুঁকি বীমা বাধ্যতামূলক ছিল, যদিও সেই ঝুঁকি বীমার মাধ্যমে কেউ ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন এমন ইতিহাস খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। “সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮”- তে মোটরযানের তৃতীয় পক্ষীয় ঝুঁকি বীমা উঠিয়ে দিয়ে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য “ট্রাস্ট ফান্ড” নামে একটি তহবিলের বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু  অদ্যাবধি সেই “ট্রাস্ট ফান্ড” গঠনই হয়নি। ফলে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত কেউই ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না। আমরা সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য একটি “ইন্ডিপেনডেন্ট ফান্ড” চাই। একইসাথে মোটরযানে তৃতীয় পক্ষীয় ঝুঁকিবীমাও কার্যকরভাবে ফেরত চাই। সরকারের দায়িত্বহীনতার কারণে, অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষ প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় আহত-নিহত হচ্ছে, অথচ সরকার দায় নিচ্ছে না। এটা সভ্য দেশে চলতে পারে না।

 

পরিশেষে আমরা বলতে চাই, দেশের সড়ক পরিবহন খাতে যে অব্যবস্থাপনা, দুনীতি, চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্য চলছে তা বন্ধ করতে হবে। এ বিষয়ে শুধু কমিটি গঠন এবং সুপারিশমালা তৈরির চক্র থেকে বেরিয়ে একটি টেকসই জনবান্ধব পরিবহন কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। এটা জাতীয় অগ্রগতির স্বার্থেই জরুরি। এজন্য প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
বিষয়: * সড়ক দুর্ঘটনা
লাইভ রেডিও
সর্বশেষ সংবাদ