সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
ঈদুল ফিতরকে ঘিরে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার ঢাকা-যমুনা সেতু পশ্চিম মহাসড়কে ঘরমুখো মানুষের অতিরিক্ত চাপ থাকলেও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনায় এবার মিলছে স্বস্তির যাত্রা। ছুটি পেয়ে কর্মজীবী মানুষ নাড়ির টানে গ্রামের বাড়ি ফিরতে শুরু করে। মহাসড়কে যানবাহনের ব্যাপক চাপ থাকলেও কোনো যানজটের সৃষ্টি হয়নি।
বুধবার (১৮ মার্চ) সিরাজগঞ্জ জেলার সয়দাবাদ গোলচত্বর, মুলিবাড়ি চেক পোষ্ট, কড্ডার মোড়, নলকা ও হাটিকুমরুল গোলচত্বর এলাকায় দেখা যায়, ঢাকা-বগুড়া, ঢাকা-রাজশাহী ও ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে যানবাহনের সংখ্যা অতিরিক্ত বাড়ছে। তবে সড়কের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবার অভিনব পদ্ধতি গ্রহণ করেছে সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশ। প্রায় ১ হাজার ২০০ পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি আকাশে উড়ছে ড্রোন ক্যামেরা, যার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে পুরো সড়ক জুড়ে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বিশেষ নজরদারি বসানো হয়েছে। ড্রোনের লাইভ ফুটেজ দেখে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যা যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে।
জানা যায়, জেলায় মোট ১০৫ কিলোমিটার মহাসড়ক রয়েছে। এর মধ্যে যমুনা সেতু পশ্চিম টোল প্লাজা থেকে হাটিকুমরুল পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার, হাটিকুমরুল থেকে নাটোর টোলপ্লাজা পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার, হাটিকুমরুল থেকে চান্দাইকোনা পর্যন্ত ২১ কিলোমিটার এবং হাটিকুমরুল থেকে বাঘাবাড়ি ঘাট পর্যন্ত ৩৪ কিলোমিটার মহাসড়ক রয়েছে। দুই লেনের সড়কটি বরাবরই ছিলো দুর্ভোগের। বিশেষ করে ঈদযাত্রা ভোগান্তি বাড়ে কয়েকগুণ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এ মহাসড়ক এখন চার লেনে উত্তীর্ণ হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা-বগুড়া মহাসড়ক সমান চওড়া। ফলে দীর্ঘ ভোগান্তির পর স্বস্তির ঈদ যাত্রা। যাত্রীদের নিরাপত্তায় পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা তৎপরতা। রাতে গাড়ি চলাচলে দেওয়া হয়ে স্কট সুবিধা। মহাসড়কে নিরাপত্তায় চাঁদ রাত পর্যন্ত চলবে নিরবচ্ছিন্ন পাহারা।
যাত্রীদের মধ্যেও স্বস্তির ছাপ স্পষ্ট। ঢাকা থেকে নাটোরগামী হাসনা বলেন, অনেক গাড়ি, কিন্তু যানজট কম। পরিবারের সঙ্গে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারছি এটাই বড় স্বস্তি।
আরেক যাত্রী রোকিয়া বলেন, প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ এবং প্রযুক্তির ব্যবহার মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়েছে। যদিও কিছু জায়গায় ধীরগতি হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। স্বস্তিতে গ্রামের বাড়িতে ফিরতে যেতে পারছি।
বাস চালক রহিম হোসেন বলেন, মহাসড়কে যানজট নাই। অতিরিক্ত পুলিশ দেওয়া হয়েছে। যমুনা সেতু পশ্চিম পাড়ে রাস্তা ফোর লেন। যাত্রীরা ভালো সেবা পাচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোন সমস্যা নাই। আশা করা যাচ্ছে ঈদে সমস্যা হবে না। সমস্যা হলে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় কিছুটা হবে। সিরাজগঞ্জ অংশে ভালো আছে।
ট্রাক চালক কবির ইসলাম বলেন, আগে রাস্তা ছোট ছিলো। এখন রাস্তা ফোর লেন হইছে এখন কোন সমস্যা হয়না। আশা করি ঈদে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবে সবাই।
এদিকে, যাতায়াত ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন থাকলেও বাড়তি ভাড়ার ভোগান্তি যাত্রীদের পিছু ছাড়ছে না।
ঢাকা থেকে আসা যাত্রী সাইদুলসহ অনেকেরই অভিযোগ করে বলেন, ঈদ উপলক্ষে পরিবহণগুলো দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করছে। সাধারণ সময়ে ৩৫০ টাকার ভাড়া এখন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। মহাসড়ক যানজট মুক্ত থাকলেও ভাড়ার এই নৈরাজ্য যাত্রীদের ঈদ আনন্দে অনেকটাই ভাটা ফেলছে।
নলকা বাজারের করিম শেখ নামে এক কাপড় ব্যবসায়ী বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার রাস্তা অনেক গাড়ি চলাচল করছে। মহাসড়কে কোনো ঝামেলা ও যানজট নেই। পুলিশি নিরাপত্তাও চোখে পড়ার মতো রয়েছে। প্রশাসনের তৎপরতার কারণে এবার মহাসড়কে শৃঙ্খলা রয়েছে। এতে যাত্রী ও চালক সবাই উপকৃত হচ্ছেন।
হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জ প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মাহবুবুল আলম বলেন, পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, সড়ক ও জনপথ মিলে মহাসড়কে কাজ করছে। যমুনা সেতু থেকে হাটিকুমল গোলচত্বর পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনের কাজ শেষ হয়েছে। হাটিকুমরুলের ইন্টার চেঞ্জের সার্ভিস লেন গুলো খুলে দেওয়ায় বগুড়া থেকে ঢাকা চার লেন চালু রয়েছে। আশা করা যায় এবারের ঈদে কোনো যানজট হবে না। ঈদ হবে শঙ্কা মুক্ত ও নিরাপদ।
হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছি। ড্রোনের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ কারণে উত্তরের মহাসড়কে এবারের ঈদযাত্রা অনেকটাই স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠেছে।
সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম সানতু জানান, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে জেলা পুলিশের প্রায় ১ হাজার ২০০ সদস্য নিরলসভাবে কাজ করছেন। এর মধ্যে নির্দিষ্ট পয়েন্টে ৬৫০ জন সদস্য এবং তিনটি বিশেষ মোবাইল টিম সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে। কোনো যানবাহন বিকল হলে বা জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে দ্রুত সহায়তার জন্য আলাদা টিম রাখা হয়েছে। যমুনা সেতু দিয়ে যানবাহন পারাপারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সোমবার ৩৫ হাজার যানবাহন পার হলেও মঙ্গলবার তা ৪০ হাজার ছাড়িয়েছে। যানবাহনের চাপ আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যাত্রী হয়রানি ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

