চট্টগ্রামে হঠাৎ বন্ধ প্যাসিফিকের দুই কারখানা, শ্রমিকদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ২০ জন আহত
শ্রমিকদের দাবি না মেনে চট্টগ্রামের ইপিজেডে প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের দুই কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে বেকার হয়ে পড়েছেন অন্তত হাজারখানেক শ্রমিক। এমনকি ‘ভাড়াটে গুন্ডাদের’ শ্রমিক সাজিয়ে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর হামলার অভিযোগও উঠেছে।
এ ঘটনায় শ্রমিকদের দু’পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে সিইপিজেড এলাকার বেপজা হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। প্যাসিফিকের দুই কারাখানা ঘিরে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সোমবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে নগরীর ইপিজেডে শ্রমিকদের দু’পক্ষের এই সংঘর্ষ হয়।
এই হামলা পূর্বপরিকল্পিত বলে জানিয়েছেন আন্দোলনরত শ্রমিকদের। তারা জানান, শ্রমিকের আড়ালে ভাড়াটে গুন্ডারা কারখানার ভেতর থেকে হঠাৎ বের হয়ে সাতসকালে গেটে অবস্থান করা শ্রমিকদের ওপর হামলা চালায়।
এর আগে ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে গেটে হঠাৎ টাঙিয়ে দেওয়া হয় অনির্দিষ্টকালের জন্য ইউনিট-১ ও ইউনিট-২ কারখানা বন্ধের নোটিশ। কারখানার মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে বলা হয়েছে, ইপিজেড শ্রম আইন ২০১৯-এর ১২(১) ধারা অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকরা অবৈধভাবে উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন এবং অযৌক্তিক দাবি তুলেছেন, যা কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করছে। এ কারণে ১০ ফেব্রুয়ারি সোমবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ইউনিট দুটি বন্ধ থাকবে।
জানা গেছে, মালিকপক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে টানা একমাস ধরে শ্রমিকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ চলছিল। এ ঘটনায় মালিকপক্ষ কিছু শ্রমিককে বাড়তি সুবিধা দিয়ে তাদের পক্ষে নেয়। কিন্তু কারখানার শ্রমিকদের ৯০ শতাংশই ছিল বঞ্চিত।
প্যাসিফিক ক্যাজুয়ালস লিমিটেডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত একমাস ধরে শ্রমিকরা নাস্তা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দাবিতে অসন্তোষ প্রকাশ করছিলেন। তবে মজুরি বা ভাতার সঙ্গে এই অসন্তোষের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ম্যানেজমেন্ট আগে শ্রমিকদের বেশ কয়েকটি দাবি মেনে নিয়েছিল। কিন্তু রোববার সকালে আবারও শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন, যা শেষ পর্যন্ত উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করে। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায়, দুপুর ২টার দিকে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এভাবে চলতে থাকলে কর্তৃপক্ষ, সব কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে। শুধু এই দুটি ইউনিটে, অন্তত ৬-৭ হাজার শ্রমিক কাজ করেন।
এ ঘটনায় চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের এএসপি জসিম উদ্দিন বলেন, সোমবার সকালে বন্ধ কারখানার শ্রমিকরা এসে, একই মালিকানাধীন অন্যান্য কারখানার শ্রমিকদের বের করার চেষ্টা করেন। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। অন্য কারখানার শ্রমিকরা বলছেন, তাদের কারখানা তো বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি, তাহলে তারা কেন কাজ বন্ধ করবেন? এ নিয়েই দু’পক্ষের মধ্যে, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পরে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
শ্রমিকদের ওপর বহিরাগতদের হামলার অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্যাসিফিক ক্যাজুয়ালস লিমিটেডের মালিক সৈয়দ মোহাম্মদ তাহমিরের মুঠোফোনে একাধিক কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
সিইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক আবদুস সোবহান বলেন, আমি ঘটনাটি শুনেছি, তবে এখনো বিস্তারিত জানি না। এটা সত্য যে, কারখানা বন্ধের ঘোষণার পর অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।
১৯৮৪ সালে মাত্র ২০০ শ্রমিক দিয়ে ছোট একটি কারখানা নিয়ে চট্টগ্রামে যাত্রা শুরু করে এনজেডএন ফ্যাশন। ১০ বছর পর চট্টগ্রাম ইপিজেডে প্যাসিফিক জিন্স নামে এটি নতুন রূপে পথচলা শুরু করে। তখন শ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় দেড় হাজার। কিন্তু এখন প্যাসিফিক জিন্সে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেন ৩২ হাজার মানুষ। শুধু চট্টগ্রাম ইপিজেডেই ছয়টি কারখানা রয়েছে তাদের। ইপিজেডের বাইরে রয়েছে নিট পোশাকের আরেকটি কারখানা। তাদের নতুন আরও দুটি কারখানা উৎপাদনে যাবে শিগগির। নগরীর আগ্রাবাদে পাঁচতারকা মানের একটি হোটেলও নির্মাণ করছে প্যাসিফিক জিন্স।