রোহিঙ্গাদের উপর মিয়ানমার সরকার যখন জাতিগত নিধন ও গণহত্যা চালিয়েছিল তখন প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ দরজা খুলে দিয়েছিল। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসও আজ সেটি মনে করিয়ে দিয়েছেন।
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, সম্পদ ও সামর্থের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ২০১৭ সালে এবং তারও আগে রোহিঙ্গাদের জীবন বাঁচাতে মানবিক কারণে সীমান্ত খুলে দিয়েছিল বাংলাদেশ।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনুরোধে বাংলাদেশের এমন পদক্ষেপ তখন বিশ্বজুড়ে তুমুল প্রসংশা কুড়িয়েছিল। সেই বিষয়টি উঠে এসেছে রোববার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দেওয়া বিবৃতিতেও। ওই বিবৃতিতে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রিন্সিপাল ডেপুটি স্পোকসপার্সন টমাস টমি পিগট বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের জনগণের প্রতি সংহতি জানিয়েছে, যার মধ্যে সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতির শিকার রোহিঙ্গা এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীও রয়েছে। পাশাপাশি, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র ধন্যবাদ জানিয়েছে এবং এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোরও প্রশংসা করেছে, যারা মিয়ানমার থেকে আসা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে।
অবশ্য ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা ঢলের শুরু থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোহিঙ্গাদের পক্ষে কথা বলে এসেছেন। কিন্তু ভারত এবং চীনের অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ইস্যুতে কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি জাতিসংঘ।
প্রধান উপদেষ্টার ৭ দফা,
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জাতিগত নির্মূল থেকে রক্ষায় বৈশ্বিক উদ্যোগের আহ্বান জানান প্রধান উপদেষ্টা। এসময় তিনি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও সংকট সমাধানে ৭ দফা প্রস্তাব ঘোষণা করেন। দফাগুলো হলো-
১) রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন
২) দাতা সংস্থার অব্যাহত সহায়তা
৩) রোহিঙ্গাদের প্রতি সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ
৪) রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনায় প্ল্যাটফর্ম স্থাপন
৫) আসিয়ান ও প্রতিবেশী দেশসহ আন্তর্জাতিক মহলের সহায়তা,
৬) জাতিগত নিধনের বিরুদ্ধে অবস্থান
৭) রোহিঙ্গাদের প্রতি সহিংসতার বিচার নিশ্চিত করা।
আরাকান আর্মি কতোটা গুরুত্বপূর্ণ প্রধান উপদেষ্টা কক্সবাজারের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের জাতিগত নির্মূলের ভয়াবহ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেকে সশস্ত্র ঘাতকদের থামানো আমাাদের নৈতিক দায়িত্ব। মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মিকে নিশ্চিত করতে হবে যাতে আর কোনো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ না করে।
রোহিঙ্গা ঢল ঠেকানো এবং প্রত্যাবাসানে মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মিও যে এখন গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর, প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যে তা প্রতীয়মাণ। এ সশস্ত্র সংগঠনটি এখন রাখাইনের অধিকাংশ শহর নিয়ন্ত্রণ করছে। সেখানে জান্তা সরকারের সাথে তারা প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছে। এর ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আরাকান আর্মির সাথেও যোগাযোগ রেখে আসছে বাংলাদেশ। গত বছরের ডিসেম্বরে এমনই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান। তবে আরাকান আর্মি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অতোটা ইতিবাচক নয় বলে জানা গেছে। বাংলাদেশে আর কোন রোহিঙ্গা যেন প্রবেশ না করে- প্রধান উপদেষ্টা আরাকান আর্মিকে সেটি নিশ্চিত করার কথা বলায় বৈশ্বিক আলোচনার টেবিলে রোহিঙ্গাদের অধিকার নিশ্চিত হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সম্মেলন রোহিঙ্গা ইস্যু বৈশ্বিক নানা ডামাডোলে অনেকটাই জৌলুস হারিয়েছিল। চাপা পড়েছিল মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের ঝরা তাজা রক্ত ও চোখের পানি। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস ক্ষমতা গ্রহণের পর বিশ্ব দরবারে কিছুটা হলেও পুনরুজ্জীবিত হয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যু। জাতিসংঘ মহাসচিবও বেশ কয়েকদিন বাংলাদেশে অবস্থান করে রোহিঙ্গা সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন। এরপর থেকেই নতুন করে আলোচনায় আসে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের বিষয়। যদিও জাতিসংঘ মহাসচিব ও প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আশ্বাস শতভাগ পূর্ণতা পায়নি। তবে বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে আছে, এটি বলা যায়। এরই ধারাবাহিকতায় কক্সবাজারের রোহিঙ্গা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন থেকে জানানো হয়, ‘সংকট মোকাবেলায় আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। যেখানে ১৭০টি দেশ অংশ নেবে।’ সেই সম্মেলন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে কতোটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে বিশ্ব সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের নাগরিকদের মিয়ানমারে ফেরাতেই হবে, যেকোন মূল্যে।