বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে, নতুবা জনগণ আমাদের ক্ষমা করবে না।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনালকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের জনগণ বহুদিন ধরে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এখন আমরা একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন গড়ে তুলতে চাই। যদি আমরা ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের বিচারের মুখোমুখি না করি, তাহলে জনগণ আমাদের ক্ষমা করবে না।”
এই বক্তব্যের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে প্রধান উপদেষ্টার এই মন্তব্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
🔹 শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
📌 নির্বাচনী কারচুপি: ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার ভোট কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
📌 দুর্নীতি: সরকারি তহবিলের অপব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।
📌 মানবাধিকার লঙ্ঘন: বিরোধী দল দমন, সাংবাদিকদের উপর নির্যাতন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ।
📌 গায়েবি মামলা ও বিচারবহির্ভূত হত্যা: রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সমালোচকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা এবং গুম-খুনের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
ড. ইউনূস বলেন, “আমরা কোনো প্রতিহিংসার রাজনীতি করছি না, কিন্তু যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতেই হবে।”
🔹 বিচার প্রক্রিয়া কবে শুরু হবে?
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস জানিয়েছেন, একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে, যা শেখ হাসিনার শাসনামলের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্ত করবে।
তিনি বলেন, “আমরা জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। এই বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার বানানো হবে না। তবে যারা অন্যায় করেছে, তারা ছাড়া পাবে না।”
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বিচারিক প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত মানদণ্ড অনুসারে পরিচালিত হবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সম্পৃক্ত করা হতে পারে, যাতে বিচার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়।
🔹 আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা এই অভিযোগকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দিয়েছেন। দলটির এক মুখপাত্র বলেন, “এটি একটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ। শেখ হাসিনা দেশের জন্য যে অবদান রেখেছেন, তা মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা এ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব।”
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থা বলেছে, বিচারকাজ অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হওয়া উচিত নয়।
🔹 বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়া
বিএনপি ও জামায়াতসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো প্রধান উপদেষ্টার এই বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছে। বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বলেন, “এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রথম পদক্ষেপ। আমরা চাই, শেখ হাসিনা ও তার সরকারের সব অনিয়মের বিচার হোক।”
তবে বিএনপির মধ্যেও কিছু শঙ্কা রয়েছে। দলটির কিছু নেতা মনে করছেন, যদি বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়, তবে জনগণের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে।
জামায়াতের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, “আমরা সব ধরনের ন্যায়বিচারের পক্ষে। আমরা চাই, শেখ হাসিনার আমলে যারা অন্যায় করেছেন, তাদের কঠোর শাস্তি হোক।”
🔹 আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ
✅ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন: পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়ে আসছিল। এই উদ্যোগকে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।
✅ জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়া: জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিচারিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মোতায়েন করা হতে পারে।
✅ যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা: যুক্তরাষ্ট্র এর আগে শেখ হাসিনার সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। ওয়াশিংটন থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু বিচারিক প্রক্রিয়া দেখতে চায় তারা।
বাংলাদেশের জনগণ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এই বিচার প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হবে তা দেখার জন্য।
প্রধান উপদেষ্টা তার বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন, “জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিচার হবে, এবং কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।”
শেষ কথা
বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক পদক্ষেপ। তবে এটি কতটা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় পরিণত হলে তা দেশের গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
দেশের সাধারণ মানুষ চায় একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা, যেখানে সত্যিই দোষীরা শাস্তি পাবে, এবং নিরপরাধরা মুক্তি পাবে। এখন দেখার বিষয়, প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে সেই লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হয়।