মাহফুজুল হক পিয়াস, ইবি:
নতুন বছরের সূর্যোদয়ে নতুন আশার আলো দেখছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীরা। ২০২৫ সালের নানা উত্থান-পতন পেরিয়ে তারা এখন আগামীর ইবিকে দেখতে চান আরও নিরাপদ, আধুনিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব এক ক্যাম্পাস হিসেবে। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা- এমন এক বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে থাকবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সুষ্ঠু প্রশাসনিক কার্যক্রম, মানসম্মত পাঠদান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ।
ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী তাজমিন রহমান বলেন, ইবি ক্যাম্পাস এখন শিক্ষার্থীদের জন্য এক সংকটের জায়গা। পরিবহন, আবাসন, মানসম্মত খাবার ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ বিভাগে নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ ও পাঠদানের উপযোগী পরিবেশ, ফলে সেশনজট লেগেই আছে। পড়াশোনা শেষ করেও নম্বরপত্র তুলতে হয় এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরে। ৪৭ বছর পরও ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিতে নেই যথেষ্ট লাইট বা সিসিটিভি। আমি চাই প্রশাসন দ্রুত এসব সংকট মোকাবিলা করে ইবিকে নিরাপদ, সুন্দর ও শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাসে পরিণত করুক।
একই বিভাগের শিক্ষার্থী জিন্নাত মালিয়াত সীমা বলেন, নতুন বছর মানেই নতুন প্রত্যাশা ও প্রতিজ্ঞা। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও এটি আত্মসমালোচনা, সংশোধন ও এগিয়ে যাওয়ার সময়। প্রশাসনের উচিত ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। শৃঙ্খলার নামে অমানবিক আচরণ নয়-বিশ্ববিদ্যালয় মুক্ত চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের স্থান। শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর শোনা, তাদের প্রয়োজন বোঝা ছাড়া শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ তৈরি সম্ভব নয়। শুধু ক্লাস ও পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ না থেকে সাংস্কৃতিক বিকাশের ক্ষেত্রগুলোও সম্প্রসারিত করতে হবে। গবেষণা সেমিনারের পাশাপাশি বিতর্ক, সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও অভিনয় উৎসব নিয়মিত আয়োজন করা উচিত।
একই বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী জয়নব ফেরদৌস জিনিয়া বলেন, নতুন বছরে আমি ইবিকে দেখতে চাই শান্ত, পরিচ্ছন্ন ও প্রযুক্তিনির্ভর এক ক্যাম্পাস হিসেবে। আধুনিক ক্লাসরুম, লাইব্রেরি ও গবেষণাগার থাকবে শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। শিক্ষক–শিক্ষার্থী সম্পর্ক হবে সহযোগিতামূলক, প্রশাসন হবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। হলে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, নিরাপদ আবাসন, WiFi ও জেনারেটরের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে মুরগির দোকানগুলোতে পরিমাপ অনুযায়ী বিক্রয় ব্যবস্থা থাকলে শিক্ষার্থীরা অপচয় এড়াতে পারবে। ইবি হবে মানবিকতা, নৈতিকতা ও নেতৃত্বের চর্চার কেন্দ্র।
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী গোলাম রব্বানী বলেন, ২০২৬ সাল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য হতে পারে গুণগত পরিবর্তনের বছর-যদি কিছু মৌলিক বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রথমত, গবেষণার পরিবেশ তৈরি করতে পর্যাপ্ত ফান্ডিং ও আধুনিক ল্যাব স্থাপন জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী ও শিক্ষক গবেষণার সুযোগ না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপ কমাতে সেশন ফি হ্রাস এবং সার্টিফিকেট উত্তোলন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক করা উচিত। এতে সময়, অর্থ ও হয়রানি-সবই কমবে। এছাড়া ক্যারিয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে আইইএলটিএস ও ইংরেজি দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রোগ্রাম চালু করা দরকার। সেশনজট কমানো ও ক্লাস–পরীক্ষার সময়সূচি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ অনেকটাই কমাবে। সর্বশেষ, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়াম সংস্কার এবং হল ডাইনিংয়ের খাবারের মান উন্নত করা এখন সময়ের দাবি। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি অর্জনের জায়গা নয়-এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন প্রস্তুতির কেন্দ্র। তাই বিশ্ববিদ্যালয়কে হতে হবে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক ও মানবিক।
ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ফারিহা তানজুম ছন্দা কবিতার ছন্দে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করেন-যেভাবে সূর্যের আলো আঁধার গ্রাস করে,প্রকৃতিতে বসন্ত বিরাজ করে, কোমল চামড়ায় বার্ধক্যের খরা নামে,কষ্ট আসলে কান্না জড়িয়ে ধরে,সেই জীবন কি আমাকে চাই!
তিনি নতুন বছরে হাদীরা যে ন্যায় ও ইনসাফের জীবন যাপন করে গেছেন, সেই আদর্শকে ধারণ করে ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
সমাজ কল্যাণ বিভাগের শিক্ষার্থী বাঁধন বিশ্বাস স্পর্শ বলেন, নতুন বছরে আমি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখতে চাই আধুনিক, গবেষণাসহায়ক ও শিক্ষার্থীবান্ধব এক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে। বর্তমান প্রশাসন শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কিছু উদ্যোগ নিলেও অনেক কিছু এখনো অসম্পূর্ণ। ভর্তি ফি ও সেশন ফি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বেশি, কোটা প্রথার কারণে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি আবাসন সংকট, পুরোনো পেমেন্ট ব্যবস্থা ও সার্টিফিকেট উত্তোলনে ভোগান্তি শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত অধিকার থেকে দূরে রাখছে। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ-এই নতুন বছরে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়ে এসব সমস্যা সমাধান করা হোক।
শিক্ষার্থীরা চায়, তাদের এই প্রত্যাশাগুলো যেন কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য হয়ে উঠুক নীতি নির্ধারণের অনুপ্রেরণা। তাহলেই নতুন বছর হবে সত্যিকারের নতুন সূচনা, নিরাপদ ও শিক্ষার্থীবান্ধব ইবির পথে।

