প্রিন্ট এর তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬
গত বছরের চেয়ে আইনের শাসনে এগিয়েছে বাংলাদেশ
ডেস্ক নিউজ ||
ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (ডব্লিউজেপি) গত ২০ অক্টোবর ‘আইনের শাসন সূচক ২০২৬’ প্রকাশ করেছে। ২০০৯ সাল থেকে সংস্থাটি নিয়মিত এ সূচক প্রকাশ করে আসছে। নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ডের ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের আইনের শাসনের অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়।গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রের সামগ্রিক অবস্থা বুঝতে এ সূচককে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। এবারের প্রতিবেদনে বিশ্বের ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩তম। গত বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২৫তম। অর্থাৎ, এবার দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ।সংখ্যার হিসাবে এই অগ্রগতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে সূচকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন চিত্র সামনে আসে। দুই ধাপ এগোলেও দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ও অবনতির উদ্বেগ কাটেনি।
প্রকৃতপক্ষে বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে ১৪৩ দেশের মধ্যে ১২৩তম হওয়া মানে আইনের শাসনের তলানির কাতারে আমরা। আরও হতাশাজনক বিষয় হলো, মোট ১ নম্বরের মূল্যায়নে যেখানে আইনের শাসনের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক স্কোর শূন্য দশমিক ৫৫ (০.৫৫), বাংলাদেশের প্রাপ্ত স্কোর মাত্র শূন্য দশমিক ৩৯৩ (০.৩৯৩)।
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে আমাদের হতাশা আরও বাড়ে। এ অঞ্চলে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান ছাড়া বাকি সব দেশই আইনের শাসনে আমাদের চেয়ে এগিয়ে। বরাবরের মতোই শীর্ষে রয়েছে নেপাল। এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে যথাক্রমে শ্রীলঙ্কা ও ভারত। এমনকি আফ্রিকার যেসব দেশকে আমরা প্রায়ই অনুন্নত বা অস্থিতিশীল বলে মনে করি, তারাও আইনের শাসনের মানদণ্ডে বাংলাদেশের চেয়ে বহুগুণ ভালো অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে ঘানা ৬২তম, কেনিয়া ১০০তম, লাইবেরিয়া ১০৩তম, সিয়েরা লিওন ১১০তম, নাইজেরিয়া ১২০তম এবং জিম্বাবুয়ে ১২২তম স্থানে রয়েছে।
উল্লেখ্য, ডব্লিউজেপি মূলত আটটি মৌলিক মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে একটি দেশের আইনের শাসন পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে থাকে। এই মানদণ্ড হলো– সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, উন্মুক্ত সরকার, মৌলিক অধিকার, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, বিধি-বিধান প্রয়োগ, দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচার। এবারের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এ আটটি মানদণ্ডের মধ্যে মাত্র তিনটিতে বাংলাদেশ সামান্য উন্নতি করতে পেরেছে। এগুলো হলো সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা (১১১তম), দুর্নীতির অনুপস্থিতি (১১৩তম) এবং বিধি-বিধান প্রয়োগ (১২৪তম)। কিন্তু বাকি পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডেই দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এর মধ্যে জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থা সবচেয়ে দুর্বল। এ খাতে শূন্য দশমিক ৩১ স্কোর নিয়ে ১৪৩টি দেশের মধ্যে ১৩৩তম স্থানে বাংলাদেশ। অর্থাৎ মৌলিক মানবাধিকার সুরক্ষার দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্বনিম্ন ১১টি দেশের একটি।
দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে নাগরিকের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি অবহেলিত হয়ে আসছে। বিনা বিচারে আটক, দলীয় বিবেচনায় মামলা, ছেলের অপরাধে বাবা কিংবা বাবার অপরাধে ছেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে এসেছে। এমনকি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের সময়ও তা থামেনি। নাগরিকদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা এখনও ভূলুণ্ঠিত। ডব্লিউজেপির মূল্যায়ন সেই চরম সত্যিকেই যেন সামনে নিয়ে এসেছে।
একইভাবে দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থার চিত্রও সমান হতাশাজনক। শূন্য দশমিক ৩১ স্কোর নিয়ে এ খাতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩২তম। বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা দেওয়ানি মামলা, আদালতের দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সীমাহীন ভোগান্তিই এ সূচকে প্রতিফলিত। ফৌজদারি বিচারের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থা খুব সুখকর নয়। ১৪৩টি দেশের মধ্যে ০.৩২ স্কোর নিয়ে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৭তম। আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা মানদণ্ডে বাংলাদেশ ১০৭তম।
গত এক বছরে বার্ষিক স্কোরে বাংলাদেশের সামান্য উন্নতি হলেও (০.৩৯১ থেকে ০.৩৯৩) ডব্লিউজেপির মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশে আইনের শাসনের সামগ্রিক স্কোরের ০.৮ শতাংশ অবনতি হয়েছে। সূচকে প্রাপ্ত নম্বর ০.৪০ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ০.৩৯-এ। এদিকে গত পাঁচ বছরে সূচকের আটটি মানদণ্ডের মধ্যে ছয়টিতেই পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০৩তম। সেখান থেকে ধাপে ধাপে পতন ঘটতে ঘটতে ২০২০ সালে অবস্থান দাঁড়ায় ১২২তম আর ২০২১ সালে হয় ১২৪তম। এরপর ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর বাংলাদেশ ১২৭তম অবস্থানে স্থবির ছিল। ২০২৫ সালে ১২৫ ঘুরে এবার ১২৩তম। অর্থাৎ গত এক দশকে আইনের শাসন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান কেবলই নিচের দিকে নামছে। মাঝেমধ্যে কোনো সূচকে সামান্য দশমিকের অঙ্কে স্কোর বাড়লেও দীর্ঘ মেয়াদে আমরা তলানিতেই আটকে আছি। যদিও কোনো বছরে কোনো একটা মানদণ্ডে সামান্য একটু উন্নতি ঘটে, পরের বছরই সেটি নিচে নেমে আসে। অনেকটা ছোটবেলার গণিত পাঠে পড়া সেই বানরের তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওপরে ওঠার গল্পের মতো।
অস্বীকার করা যাবে না, আইনের শাসনের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মূল কারণ নিহিত আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর দুর্বলতার মধ্যে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মৌলিক সত্য হলো– গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন পরিপূরক; একটি ছাড়া অন্যটির অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। গণতন্ত্র যদি একটি রাষ্ট্রের হৃৎপিণ্ড হয়, তবে আইনের শাসন তার রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র যেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শয্যাশায়ী আর রাজনীতি বন্দি হয়ে আছে দলতন্ত্র এবং ভোটতন্ত্রের খোলসে। প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি তো গায়েব অনেক আগে থেকেই; রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রায় সব সংস্থা হয়ে উঠেছে দলীয় স্বার্থরক্ষার বাহিনী-নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতিয়ার। অবস্থা এমনই, সরকারি অভিধান থেকে নিরপেক্ষতা শব্দটিই বিলুপ্তপ্রায়। এ অবস্থায় আইনের শাসন স্বাভাবিক কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলাই স্বাভাবিক। ডব্লিউজেপির মূল্যায়ন সে সত্যিকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
স্বীকার করতে হবে, যে কোনো দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ এবং নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি হলো আইনের শাসন। যে দেশে মৌলিক অধিকার বিপন্ন এবং বিচার ব্যবস্থা দুর্বল, সে দেশে টেকসই উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। ডব্লিউজেপির আইনের শাসনের সূচক আমাদের রাষ্ট্রের ভেতরের সে ক্ষতগুলোকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। সেগুলোকে যদি যথাযথভাবে মোকাবিলা করা না যায়, আমাদের টেকসই উন্নয়ন যে বাধাগ্রস্ত হবে, তা তো বলাই বাহুল্য। তাই বৈশ্বিক সূচকে দুই ধাপ এগোনোর সস্তা আত্মতুষ্টিতে না ভুগে রাষ্ট্রকে তার নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে এবং তাই হতে হবে এ মুহূর্তের প্রধান জাতীয় অঙ্গীকার।
মোশতাক আহমেদ: কলাম লেখক; সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা
প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম