প্রিন্ট এর তারিখ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬
কাজ বাঁচাতে জরায়ু কেটে বাদ দিচ্ছেন ভারতের আখ কাটা শ্রমিকরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ||
বিশ্বে আখ উৎপাদনের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভারতে উৎপাদিত চিনির একটি বড় অংশ সরবরাহ করা হয় কোকা-কোলা ও পেপসিকোর মতো বহুজাতিক কোমল পানীয় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানে। তবে এই মিষ্টি শিল্পের নেপথ্যে রয়েছে এক নির্মম ও মর্মান্তিক মানবিক বিপর্যয়। ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ভারতের আখখেতগুলোর অমানবিক কর্মপরিবেশ এবং নারী শ্রমিকদের অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক কষ্টের চিত্র উঠে এসেছে।পুরো ভারতজুড়ে আনুমানিক ১৫ লাখ মানুষ আখ কাটার কাজে নিয়োজিত। এর একটি বড় অংশ আসেন ভারতের মধ্য মহারাষ্ট্রের প্রত্যন্ত বিদ জেলা থেকে। নিজের এলাকায় কাজ না থাকায় এবং ঋণের বোঝা মেটাতে পরিবারসহ পাঁচশ কিলোমিটার দূরে কর্ণাটকের রামনালে তাঁবু গেড়ে কাজ করতে বাধ্য হন তারা।সাধারণত স্বামী-স্ত্রী জুটি বেঁধে ‘কয়তা’ হিসেবে ভোর চারটা থেকে রাত পর্যন্ত টানা ১৪ ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন। দৈনিক মাত্র ৪০০ রুপি মজুরিতে কাজ করা এসব শ্রমিকের জীবনে বিশ্রামের কোনো সুযোগ নেই। ঠিকাদারদের কাছ থেকে নেওয়া অগ্রিম দাদনের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে তারা এক প্রকার আধুনিক দাসে পরিণত হন। দলের কেউ অসুস্থ হলে বা কাজ থামালে অন্যদের ওপর বাড়তি কাজের চাপ ও আর্থিক জরিমানার খড়্গ নেমে আসে।টয়লেট বা সুপেয় পানির সুবিধাবিহীন অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোতে বসবাসকারী নারী শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা পোহাতে হয় ঋতুস্রাব, গর্ভাবস্থা কিংবা গর্ভপাতের সময়ে। একদিন কাজ বন্ধ রাখলেই মজুরি কাটার পাশাপাশি ঠিকাদারকে জরিমানা দিতে হয়। ফলে চরম শারীরিক কষ্ট ও তীব্র পেটব্যথা উপেক্ষা করেই তাদের মাঠে কাজ চালিয়ে যেতে হয়।কাজের তাগিদে এবং ঋতুস্রাবের সময়ে ছুটি না পাওয়ার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে অনেক নারী অস্ত্রোপচার করে জরায়ু ফেলে দেওয়ার চরম সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। পূর্ণিমা ও সবিতার মতো বহু নারী শ্রমিক জানান, মাঠের অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে তারা এই পথ বেছে নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যথানাশক সেবন বা চিকিৎসকদের বিভ্রান্তিকর পরামর্শের কারণে নারীরা ইনফেকশনসহ দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক জটিলতার শিকার হচ্ছেন। ২০১৯ সালের এক সরকারি জরিপে দেখা যায়, শুধু মহারাষ্ট্রের বিদ জেলারই প্রায় ১৪ শতাংশ নারী শ্রমিক জরায়ু অস্ত্রোপচারের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে অর্ধেকের বেশি নারী নানা শারীরিক ও মানসিক জটিলতায় ভুগছেন।বোম্বে হাইকোর্ট পরিযায়ী শ্রমিকদের সঠিক নিবন্ধন, কল্যাণমূলক সুবিধা এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে একাধিক নির্দেশ জারি করলেও মাঠপর্যায়ে এর কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটেনি। ভুক্তভোগী নারীদের অভিযোগ, তারা সরকারি কোনো সহায়তা বা প্রতিকার পাচ্ছেন না।অন্যদিকে, কোকা-কোলা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের জন্য সুপেয় পানি, শৌচাগার ও স্বাস্থ্যসামগ্রী নিশ্চিত করতে কাজ করার দাবি জানালেও পেপসিকো এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। সব মিলিয়ে, কঠোর বাস্তবতার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ভারতের আখখেতের নারী শ্রমিকদের জীবন অনিশ্চয়তা আর নরকীয় যন্ত্রণার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।
তথ্যসূত্র:
দ্য ইনডিপেনডেন্ট
প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম