প্রিন্ট এর তারিখ : ২২ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ অক্টোবর ২০২৬
ধামইরহাটে সম্পদের লোভে বড় বোনকে হত্যা, ছোট ভাই-ভাবীসহ গ্রেপ্তার ৫
মো: এ কে নোমান, জেলা প্রতিনিধি ||
নওগাঁর ধামইরহাটে সম্পদের লোভ, স্বর্ণালংকার আত্মসাৎ ও পারিবারিক বিরোধের জেরে হালিমা বেগম (৬৫) নামে এক বৃদ্ধাকে হত্যার ঘটনায় তাঁর ছোট ভাই ও ভাবীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের এক দিনের মধ্যে এ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন নিহতের ছোট ভাই মজনু রহমান (৫৬), তাঁর স্ত্রী হোসনে আরা (৪২), রবিউল ইসলাম (৩৯), হামিদুর রহমান (৫৫) ও মোশারফ হোসেন (৪৫)। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রশি ও ওড়না জব্দ করা হয়েছে।বুধবার (২১ অক্টোবর) নওগাঁ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান। এ সময় পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।পুলিশ সুপার জানান, গত ১৯ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে ধামইরহাট উপজেলার ছিলিমপুর (তালবোনা) গ্রামের একটি বাঁশঝাড়ের পাশে ধানখেতের আইলে হালিমা বেগমের মরদেহ পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ। তাঁর বসতবাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে মরদেহটি পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ দেখতে পায়, বৃদ্ধার একটি কানের লতি কাটা এবং অপর কানের লতি ছেঁড়া। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তাঁকে হত্যার শিকার বলে ধারণা করা হয়।এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর ধামইরহাট থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করা হয়। মামলা দায়েরের পর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পত্নীতলা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শরিফুল ইসলাম ও ধামইরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিন্টু রহমানের নেতৃত্বে বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়। স্থানীয় তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ওই দিন গভীর রাতে অভিযান শুরু করে পুলিশ।অভিযানে প্রথমে ধামইরহাট উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের ছিলিমপুর (তালবোনা) গ্রাম থেকে আলিমদ্দিনের ছেলে মজনু রহমান ও মজনুর স্ত্রী হোসনে আরাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে আলমপুর ইউনিয়নের বস্তাবর গ্রাম থেকে শহিদুল ইসলামের ছেলে রবিউল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া ছিলিমপুর গ্রাম থেকে মৃত ইসমাইল হোসেনের ছেলে হামিদুর রহমান ও মোশারফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রশি ও ওড়না জব্দ করা হয়।পুলিশের তদন্তে জানা যায়, হালিমা বেগম ছিলেন নিঃসন্তান ও স্বামী পরিত্যক্ত। প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি বাবার বসতবাড়িতে ছোট ভাই মজনুর বাড়ির পেছনে টিনের ছাউনি দেওয়া একটি ছোট ঘরে বসবাস করতেন। একটি গরু, তিনটি ছাগল ও কয়েকটি হাঁস-মুরগি পালন এবং অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি।হালিমা তাঁর জমানো টাকা বড় ভাইয়ের ছেলে রুবেলের কাছে জমা রাখতেন। রুবেলকে তিনি বিশ্বাস করতেন। অন্যদিকে, ছোট ভাই মজনু ও তাঁর স্ত্রীকে টাকা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে মাঝেমধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হতো। মজনুর বাড়িতে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের যাতায়াতও হালিমা পছন্দ করতেন না। এ ছাড়া তাঁর গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি, কানের স্বর্ণের দুল ও নাকফুলের প্রতিও আসামিদের লোভ ছিল।প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, গ্রেপ্তার রবিউল ইসলাম এলাকায় মাদক বিক্রির জন্য যাতায়াত করতেন। হালিমা এতে বাধা দেওয়ায় তাঁর সঙ্গে রবিউলের একাধিকবার তর্কাতর্কি হয়। হামিদুর রহমান ও মোশারফ হোসেনের সঙ্গেও হালিমার আগে থেকে বিরোধ ছিল। এসব বিরোধ, সম্পদের প্রতি লোভ এবং মাদক বিক্রিতে বাধা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মজনু ও তাঁর স্ত্রী হোসনে আরার পরিকল্পনায় পাঁচজন মিলে হালিমাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। ঘটনার প্রায় পাঁচ দিন আগে তাঁরা এ পরিকল্পনা করেন।পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৮ অক্টোবর দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে হামিদুর রহমান হালিমাকে তাঁর ঘর থেকে ডেকে বের করেন। এরপর অন্যরা তাঁর মুখ চেপে ধরে টেনেহিঁচড়ে বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে একটি খড়ের পালার পেছনে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর হাত রশি দিয়ে বেঁধে গলা চেপে ধরে পরনের ওড়না দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।হত্যার পর হালিমার কানের দুল নেওয়ার জন্য হামিদুর রহমান তাঁর একটি কানের লতি কেটে ফেলেন এবং অপর কানের লতি ছিঁড়ে ফেলেন। পরে মরদেহ গোপন করার উদ্দেশ্যে তিনজন মিলে সেটি পুকুরপাড়ের নিচ দিয়ে নিয়ে বাঁশঝাড়ের ওপারে ফেলে রাখেন। সেখানে তাঁর হাতের বাঁধন খুলে রশিটি ফেলে দেওয়া হয়। পরে মজনু নিহতের চোখ-মুখের ওপর হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ওড়নাটি ঢেকে দেন। এরপর আসামিরা যে যার মতো বাড়িতে চলে যান। হালিমার কানের দুলের একটি মজনু এবং অপরটি হামিদুর নিয়ে নেন।পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে আদালতে পাঠানো হয়েছে। নওগাঁ জেলা পুলিশ জেলায় অপরাধ দমন ও প্রতিরোধ এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তারে তৎপর রয়েছে।
প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম