প্রিন্ট এর তারিখ : ১১ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১১ অক্টোবর ২০২৬
শিবচরে রাতের আঁধারে জমি দখল ও গাছ কাটার অভিযোগ
ডেস্ক নিউজ ||
মাদারীপুরের শিবচরে রাতের আঁধারে পৈতৃক জমি দখল, প্রায় দুই শত বছরের পুরোনো কাঁঠালগাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে ফেলা এবং জমিতে তারের বেড়া দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্য মাহাবুব খান, তাঁর ভাই আদম ব্যবসায়ী সোহেল খান এবং তাঁদের বোন সোমা আক্তারের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় পৈতৃক সম্পত্তি হারানোর আশঙ্কা ও নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন ভুক্তভোগী সরদার পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের সঙ্গে কয়েক শ এলাকাবাসীও অংশ নেন।রোববার (১১ অক্টোবর) সকালে শিবচর উপজেলার ভদ্রাসন ইউনিয়নের সাহাপাড়া গ্রামে এ কর্মসূচি পালিত হয়। এ সময় বক্তারা জমির মালিকানা যাচাই, গাছ কাটার ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।রাতের আঁধারে গাছ কেটে জমি দখলের অভিযোগভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, গত ৪ অক্টোবর দিবাগত রাত দেড়টার দিকে ১৫ থেকে ২০ জন লোক নিয়ে তাঁদের পৈতৃক প্রায় ২৫ শতাংশ জমিতে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে ফেলা হয়। পরে ওই জমিতে তারের বেড়া দিয়ে সীমানা তৈরি করা হয়। কেটে ফেলা গাছগুলোর আনুমানিক মূল্য কয়েক লাখ টাকা বলে দাবি পরিবারের সদস্যদের।পরিবারটির অভিযোগ, জমিটি তাঁদের দীর্ঘদিনের ভোগদখলে রয়েছে। সেখানে পূর্বপুরুষদের হাতে লাগানো পুরোনো গাছও ছিল। রাতের আঁধারে এসব গাছ কেটে জমিতে বেড়া দেওয়ার ঘটনায় তাঁরা নিজেদের সম্পত্তির অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।চার বোনের পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধসরদার পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সাহাপাড়া এলাকায় প্রায় দুই শত বছর ধরে তাঁদের পূর্বপুরুষেরা বসবাস করে আসছেন। পরিবারের প্রয়াত দবির উদ্দিন সরদারের মৃত্যুর পর তাঁর চার মেয়ে পৈতৃক সম্পত্তি ভোগদখল করে আসছেন। সম্প্রতি একই এলাকার প্রয়াত ফজলুল খানের ছেলে মাহাবুব খান ও সোহেল খান এবং মেয়ে সোমা আক্তারের সঙ্গে ওই জমি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।ভুক্তভোগীদের দাবি, জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধ থাকলেও তা আইনগতভাবে নিষ্পত্তি না করে রাতের আঁধারে গাছ কেটে জমি দখলের চেষ্টা করা হয়েছে। এতে তাঁদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিবিজড়িত সম্পত্তি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগজমি দখলের অভিযোগের পাশাপাশি মাহাবুব খান, সোহেল খান ও সোমা আক্তারকে ঘিরে আরও কিছু গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের কেউ কেউ। তাঁদের অভিযোগ, মাহাবুব ও সোহেলের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা ও মানবপাচারসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া সোমা আক্তারের বিরুদ্ধেও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, এলাকার কিছু তরুণকে প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ বছর আগে ফজলুল খান আর্থিক সংকট ও দেনার দায়ে মারা যান। তাঁদের দাবি, সে সময় তাঁর ঋণ পরিশোধ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল এবং লাশ দাফনেও পাওনাদারদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। অথচ বর্তমানে তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিপুল সম্পদ অর্জন ও জমি দখলের অভিযোগ উঠছে বলে দাবি তাঁদের।পরিবারটির সদস্যরা এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি অভিযুক্তদের সম্পদের উৎস এবং এলাকায় মাদক ও মানবপাচারসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত দাবি করেছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এই প্রতিবেদন তৈরির সময় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্যও পাওয়া সম্ভব হয়নি।বাধা দিলে হুমকির অভিযোগ, নিরাপত্তাহীনতায় পরিবারভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, গাছ কাটা ও জমিতে বেড়া দেওয়ার সময় বাধা দিতে গেলে তাঁদের হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনার পর থেকে তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন।পরিবারটির সদস্যদের দাবি, জমির কাগজপত্র তাঁদের কাছে রয়েছে। তারপরও জমিতে বেড়া দেওয়ার ঘটনায় তাঁরা উদ্বিগ্ন। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পৈতৃক সম্পত্তির দখল হারানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও বিরোধ ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।থানায় অভিযোগ, সহযোগিতা না পাওয়ার দাবিভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার পরদিন সকালে তাঁরা শিবচর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে অভিযোগ করার পরও প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি বলে দাবি তাঁদের।প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা বলেন, জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে তা আদালত বা সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা উচিত। কোনো পক্ষেরই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। তাঁরা অভিযোগের ভিত্তিতে জমির কাগজপত্র যাচাই, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, গাছ কাটার ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানান।‘দেশে কি আইন-আদালত নেই?’ভুক্তভোগী রুজিয়া আক্তার খুকু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দেশে কি আইন-আদালত নেই? রাতের আঁধারে আমাদের পূর্বপুরুষদের লাগানো গাছ কেটে জমি দখল করা হবে কেন? আমাদের কাছে জমির কাগজপত্র রয়েছে। তারপরও আমাদের জমিতে বেড়া দেওয়া হয়েছে। থানায় অভিযোগ করেও আমরা কোনো সহযোগিতা পাইনি। আমরা সরকারের কাছে ন্যায়বিচার চাই।”দবির সরদারের আরেক মেয়ে রুবিয়া খানম রাইতি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমরা চার বোন বাবার সম্পত্তি ভোগদখল করে আসছি। এলাকার মানুষও জানেন, এই সম্পত্তি আমাদের। অথচ আমাদের গাছ কেটে জমি দখল করা হচ্ছে। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।”অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নিঅভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মাহাবুব খান ও সোহেল খানের বাড়িতে গিয়ে তাঁদের পাওয়া যায়নি। তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কেউ এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। ফলে মাহাবুব খান, সোহেল খান ও সোমা আক্তারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।পুলিশের বক্তব্যএ বিষয়ে শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল হোসেন বলেন, “কোনো জায়গার বিষয়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলে তা অমান্য করার অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জায়গা-জমি নিয়ে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার বিষয়ও থাকতে পারে। বিষয়টি সে রকম কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।”নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় পরিবারপৈতৃক সম্পত্তি রক্ষা, কেটে ফেলা গাছের ক্ষতিপূরণ, জমির প্রকৃত মালিকানা ও দখল যাচাই এবং পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সরদার পরিবারের সদস্যরা।
প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম