প্রিন্ট এর তারিখ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬
ইরান-মার্কিন সংঘাতের অষ্টম মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রণতরি ও সেনা মোতায়েন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ||
ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিধ্বংসী সামরিক সংঘাতের অষ্টম মাসে গড়ালেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে শান্তির কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না। একদিকে যখন কূটনৈতিক দরকষাকষির কানাঘুষো চলছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় তাদের তৃতীয় বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস থিওডর রুজভেল্ট’ (USS Theodore Roosevelt) স্ট্রাইক গ্রুপসহ অতিরিক্ত মেরিন সেনা পাঠানোর মাধ্যমে নিজেদের সামরিক অবস্থান চরম মাত্রায় সুসংহত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী (Midterm) নির্বাচনের ঠিক এক মাস আগে পেন্টাগনের এ ধরনের ভারী সামরিক মোতায়েন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ মার্কিন রাজনীতিতে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।🚢 নতুন মোতায়েনের রূপরেখা ও সামরিক ক্ষমতাপেন্টাগন ও সামরিক ট্র্যাকিং ডাটা অনুযায়ী, সান দিয়েগোর নৌঘাঁটি থেকে রওনা দেওয়া অতিরিক্ত সামরিক বহরটি নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইরানের কাছাকাছি কৌশলগত অবস্থানগুলোতে পৌঁছাবে:ইউএসএস থিওডর রুজভেল্ট স্ট্রাইক গ্রুপ: এই বহরে বিমানবাহী রণতোরির সঙ্গে যুক্ত থাকছে একাধিক গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, ক্রুজার এবং আধুনিক স্টিলথ যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ (F-35)। মাকিন আইল্যান্ড অ্যাম্ফিবিয়াস গ্রুপ ও মেরিন সেনা: প্রায় ২ হাজারের বেশি উভচর মেরিন সেনাসহ ‘ইউএসএস মাকিন আইল্যান্ড’ এমইইউ বহরে যুক্ত হচ্ছে। অতিরিক্ত সেনা বলয়: নাবিক, পাইলট ও মেরিন মিলিয়ে নতুন করে প্রায় ৯ থেকে ১০ হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা অঞ্চলটিতে যুক্ত হতে যাচ্ছে, যা বিদ্যমান ৫০ হাজার সেনাবহরের শক্তিকে দ্বিগুণ মাত্রায় সম্প্রসারিত করবে। মধ্যপ্রাচ্যে পূর্বের সামরিক ঘাঁটি ও প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫৮ সালে প্রথম লেবানন সংকটের সময় বৈরুতে সেনা পাঠিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি উপস্থিতি বৃদ্ধি করে। বর্তমানে বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব ও আমিরাতসহ অন্তত ১৯টি স্থানে মার্কিন স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে।২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর থেকে এই অঞ্চলে এত বিপুল পরিমাণ যুদ্ধবিমান (ই-থ্রি অ্যাওয়াকস, এফ-২২, এফ-১৫, এফ-১৬) এবং 'ত্রিপোলি' ও 'বক্সার' অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপের মতো ভারী নৌ ও এয়ারবর্ন ফোর্স আর কখনো মোতায়েন দেখা যায়নি। পেন্টাগনের বার্তা স্পষ্ট—যুদ্ধবিরতি বা কূটনৈতিক চুক্তি যাই হোক না কেন, কোনো সরঞ্জাম বা সেনা এখনই প্রত্যাহার করা হবে না।তিনটি মূল প্রেক্ষাপট১. দরকষাকষিতে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ (Maximum Pressure):ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া সংক্রান্ত কিছু শর্তসাপেক্ষ প্রস্তাব সম্প্রতি প্রত্যাখ্যান করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ওয়াশিংটন চাচ্ছে ইরানের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতার আগে তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে পুরোপুরি নস্যাৎ বা নিয়ন্ত্রণে আনতে। অতিরিক্ত তিন-তিনটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার (ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এবং ইউএসএস থিওডর রুজভেল্ট) মোতায়েন রাখা মূলত তেহরানকে টেবিল টকে নিজেদের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করার চূড়ান্ত সামরিক মহড়া।২. প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঝুঁকি: নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় এবং যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম চরম বৃদ্ধির ফলে মার্কিন অর্থনীতি ও ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নির্বাচনের পর ট্রাম্প প্রশাসন যদি ইরানের ওপর পূর্ণমাত্রার বা আরও মারাত্মক বিমান হামলা চালায়, তবে তার আগাম প্রস্তুতি হিসেবেই পেন্টাগন এই বিপুল বলয় গড়ে তুলছে।৩. অর্থনৈতিক অবরোধ কঠোরকরণ:সামরিক চাপের সঙ্গে সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ইরানের রেলওয়ে, নির্মাণখাত ও অটোমোবাইল শিল্প প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে তেহরানের আয়ের শেষ উৎসগুলোও বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।সর্বোপরি, মধ্যপ্রাচ্যের প্রণালিগুলোতে তেলবাহী ট্যাঙ্কারে লাগাতার হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-বহরের তৃতীয় বৃহৎ সমাবেশ ইঙ্গিত দিচ্ছে—নভেম্বর নির্বাচনের আগে বা ঠিক পর পরই ইরান-মার্কিন সংঘাত নতুন ও আরও ভয়াবহ মোড়ে মোড় নিতে পারে।
প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম