প্রিন্ট এর তারিখ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বিশ্ব শান্তির অভাব
||
বাংলাদেশ সহ ১৯৩ টি দেশ জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ, জীবন হানি ও ক্ষয়ক্ষতির কথা বিবেচনা করে ১৯৪৫ সালে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পৃথিবীতে আর কোন যুদ্ধ, জীবন হানি এবং সম্পদ নষ্ট হবে না এটাই ছিল জাতিসংঘের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। জাতিসংঘের মাধ্যমে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, কোন দেশ অন্যায় ভাবে অন্য কোন দেশের উপর আধিপত্য বিস্তার করবেনা। প্রভু নয় ,সব দেশ হবে একে অপরের বন্ধু।যে মহৎ উদ্দেশ্য ও ব্রত নিয়ে জাতিসংঘ তৈরি হয়েছিল তার সম্মান মর্যাদা জাতিসংঘ রাখতে পারেনি। ক্রমাগত যুদ্ধ, রক্তাক্ত জনপদ, ক্রন্দন, স্বজন হারা শোকার্ত মানুষের আর্তনাদ, বারুদের গন্ধ, পৃথিবীকে অশান্ত ও অভিশপ্ত করে তুলেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ইরাক- ইরান, ভারত- পাকিস্তান, রাশিয়া- ইউক্রেন, লিবিয়া, ইরাক, ভেনেজুয়েলা, ও গ্রীনল্যান্ডে মার্কিন আগ্রাসন, ফিলিস্তিন- ইজরাইল ,আমেরিকা- ইরান সহ বিভিন্ন যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষের মহামূল্যবান প্রাণহানি ঘটেছে ,সম্পদ ও বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে। জাতিসংঘ কী কোন যুদ্ধ ও রক্তপাত বন্ধ করতে পেরেছে?মিয়ানমারের জান্তা সরকার হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে বাড়িঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করেছে। বাংলাদেশে তারা শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় পেয়েছে । মানবিক কারণে বাংলাদেশ সরকার তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব ডঃ মোহাম্মদ ইউনুস সরকারের আমন্ত্রণে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। মায়ানমার সরকারের মানবতা বিবর্জিত কাজ স্বচক্ষে অবলোকন করেও জাতিসংঘের মহাসচিব মহোদয় কোন সমাধান দিতে পারেন নি। স্বয়ং জাতিসংঘ মহাসচিব যখন অসহায় তখন পৃথিবীতে শান্তির বার্তা শোনাবে কে? জাতিসংঘে বিশ্ব নেতারা তাদের নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করে বক্তব্য প্রদান করেছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান অনেক কথার মধ্যে ফিলিস্তিনি মুক্তিকামী মানুষের স্বাধীনতার কথা বলেছেন। তিনি শান্তিময় পৃথিবী গড়ার জন্য জাতিসংঘকে গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছেন। খাদ্যাভাবে এবং ইসরাইলের অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের আঘাতে ছোট ছোট শিশুরাও প্রাণ হারিয়েছে ।অথচ এই সুন্দর পৃথিবী নয়ন ভরে উপভোগ করার, দেখার অধিকার তাদের ছিল। পাষাণ হৃদয়ের অধিকারী সাইকো ট্রাম্প এবং কসাই নেতানিয়াহু আক্রমণ করে বিশ্বকে দু ভাগে বিভক্ত করেছে। ইজরায়েলের প্রেসিডেন্ট এর বক্তব্যের সময় সাতটি মুসলিম দেশ বাদে অন্যান্য মুসলিম দেশ সহ ৭৫টি দেশ ওয়াক আউট করেছে। ফিলিস্তিনে জেনোসাইড এর নায়ক আমেরিকা ও ইসরাইলের যেখানে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হওয়ার কথা, জাতিসংঘে যাদের ধিক্কার জানাবার কথা, তারাই জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়েছেন। তখন আমেরিকার রাস্তায় লক্ষ লক্ষ জনগণ ফিলিস্তিনিদের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। এ লজ্জা কার? নিশ্চয়ই জাতিসংঘের।আমেরিকা ও ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্য কে অশান্ত করে তুলেছে। ১১৬৮১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কয়েকটি মুসলিম দেশের সহায়তায় ফিলিস্তিন ও ইরান আক্রমণ করেছে। ইরান হলো মুসলিম বিশ্বের এমন একটি দেশ যারা আমেরিকার রক্তচক্ষু ও পারমাণবিক অস্ত্রের ভয় না করে আল্লাহর সাহায্যের উপর বলীয়ান হয়ে সাহসিকতার সাথে মোকাবেলা করেছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। জাতিসংঘের মঞ্চে ইরানি প্রেসিডেন্ট আমেরিকাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করে বীরের মত বুক টানটান করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে কথা বলেছে। তারাই প্রকৃত বীরের জাতি। বিশ্ব সন্ত্রাসের নায়ক আমেরিকা বিভিন্ন দেশের মানুষের সুখ শান্তি হরণ করে এই সুন্দর পৃথিবীকে অশান্ত করে তুলেছে। আমেরিকা যদি জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রক হয় তাহলে বিভিন্ন দেশের মধ্যে অশান্তি ,যুদ্ধ বন্ধ করা তো দূরের কথা বিশ্বে অশান্তির প্রভাব দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাবে।আজ যদি ও আই সি শক্তিশালী হত তাহলে মক্কা চুক্তির প্রয়োজন হতো না। ভারতে মুসলিম নিধন ও মসজিদ ভাঙার কাজ মোদি সরকার করতে সাহস পেতেন না। একসময় হিন্দুস্তানে মোগল সম্রাটেরা শাসন করেছেন। তখন তো কোন হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়নি। জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে মুসলিম দেশগুলোর কেউ এর প্রতিবাদ করেননি। সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের বিরুদ্ধে কিছুটা হলেও অবস্থান নিয়েছেন। আমেরিকা মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরি করে ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে আস্তানা তৈরি এবং তা পাকাপোক্ত করতে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েফ এরদোয়ান জাতিসংঘের মঞ্চে যে বলিষ্ঠ ভাষায় কথা বলেছেন তা প্রশংসার দাবিদার। দুঃখজনক হলেও সত্য যে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান ছাড়াই জাতিসংঘের ৮১ তম অধিবেশন শেষ হয়েছে। অধিবেশনে একে অপরের প্রতি দোষারোপ ও হুমকি প্রদান করে সুন্দর এই পৃথিবীকে আরো অশান্তিময় করে তুলেছে।এই সংস্থাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হলে বিভিন্ন দেশের বিদ্যমান সমস্যা গুলো চিহ্নিত করে এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে সমস্যার সমাধান করতে পারলে জাতিসংঘ সকল দেশের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে। পরাশক্তি নয় ছোট দেশের কথা বা পরামর্শ যদি যৌক্তিক হয় সেটাই জাতিসংঘে পাশ হবে। তাহলে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ,আনুগত্য বোধ দৃঢ় হবে ।ন্যায় বিচার নিশ্চিত হবে ।কোন পরাশক্তি প্রভাব খাটাতে পারবে না । ভেটো ক্ষমতা রোহিত করে সবার অংশগ্রহণ ও মতামতের ভিত্তিতে এই সংস্থা পরিচালিত হবে। তাহলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে ন্যায় বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে বক্তৃতা প্রদান করবেন। জাতিসংঘের প্রতি বিভিন্ন দেশের সম্মান মর্যাদা আনুগত্যবোধ প্রকাশ পাবে। আর এর ব্যত্যয় হলে বিদ্যমান অশান্তি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাবে। চলমান পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অবস্থা অবলোকন করে বোঝা যায়, জাতিসংঘ বড় অসহায় 'জোর যার মুল্লুক তার'। এই যদি হয়, তাহলে এই অশান্ত পৃথিবীকে শান্ত করবে কে?মোঃ আব্দুর রাজ্জাক লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকঅধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ,সমাজকর্ম বিভাগ, মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ, ঢাকা
প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম