প্রিন্ট এর তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রিজন ভ্যান থেকে যেভাবে পালাল জেনেভা ক্যাম্পের মাদক কারবারি
ডেস্ক নিউজ ||
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প দীর্ঘদিন ধরেই মাদক কারবার, আধিপত্য বিস্তার ও বিভিন্ন অপরাধকে কেন্দ্র করে সংঘাতের কারণে আলোচনায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একের পর এক অভিযান সত্ত্বেও সেখানে মাদকের বিস্তার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অপরাধীদের এক গ্রুপের পতনের পর অন্য গ্রুপের উত্থানও দেখা গেছে।এই অপরাধজগতের আলোচিত নাম রাজা ওরফে ‘পিচ্চি রাজা’। একসময় ক্যাম্পের অপরাধজগতের গডফাদার ইশতিয়াকের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। শুরুতে পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করলেও পরবর্তী সময়ে মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ধীরে ধীরে ক্যাম্পের অন্যতম প্রভাবশালী মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিতি পান।গত ১৯ মে নেপাল থেকে দেশে ফেরার পর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পিচ্চি রাজাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তখন তার বয়স ছিল ২৭ বছর। পুলিশের তথ্য ও মামলার বিবরণ অনুযায়ী, মাদক, অস্ত্র, হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ তার বিরুদ্ধে ৩০টির বেশি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু মোহাম্মদপুর থানাতেই ২৯টি মামলা রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে তিনটি হত্যা, সাতটি হত্যাচেষ্টা, চারটি বিস্ফোরক এবং ১৩টি মাদকসংক্রান্ত মামলা।তবে সর্বশেষ আলোচনায় আসেন তিনি প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার আদালত থেকে কাশিমপুর কারাগারে নেওয়ার পথে গাজীপুরের নাওজোড় এলাকায় টয়লেটে যাওয়ার কথা বলে প্রিজন ভ্যান থেকে বের হন পিচ্চি রাজা। এরপর আর ভ্যানে ফেরেননি তিনি। এ ঘটনায় দায়িত্বে থাকা পাঁচ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।গ্রেফতারের পর পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্যে নিজের অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়ার একটি বর্ণনা দেন পিচ্চি রাজা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন তিনি। পরে আয় কম হওয়ায় গ্যাস পাম্পে চাকরি নেন। সেখানে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার টাকা আয় হতো। একটি ঘটনায় চাকরি হারানোর পর আবার ক্যাম্পে ফিরে আসেন।পিচ্চি রাজার দাবি, ২০১৮ সালে ক্যাম্পে পুলিশের অভিযানের সময় তাকে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে মাদক না পাওয়ার পরও ৫১ পিস ইয়াবার মামলা দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি পুলিশকে জানান। সেটিই ছিল তার প্রথম মামলা। প্রায় দুই মাস কারাগারে থাকার পর জামিনে বের হয়ে মাদক বিক্রি শুরু করেন। প্রথম দিকে অল্প পরিমাণ মাদক কিনে বিক্রি করতেন এবং দৈনিক প্রায় এক হাজার টাকা আয় হতো বলে তার বক্তব্য।পরবর্তী সময়ে আবার কারাগারে গেলে সেখানে বিভিন্ন অপরাধীর সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তিনি আরও বড় পরিসরে মাদক ব্যবসায় যুক্ত হন বলে পুলিশকে জানান।স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, ২০১৪ সালের পর অল্প বয়সেই ইশতিয়াকের সঙ্গে যুক্ত হন রাজা। একই সময়ে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স হিসেবেও কাজ করতেন তিনি। ফলে ক্যাম্পের অপরাধজগতের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের সঙ্গেও তার যোগাযোগ তৈরি হয় বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। ২০২০ সালে ইশতিয়াকের মৃত্যুর পর ক্যাম্পের একটি অংশের মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ পিচ্চি রাজার হাতে আসে বলে তাদের দাবি।পরবর্তী সময়ে টেকনাফ থেকে মাদকের চালান এনে জেনেভা ক্যাম্পে সরবরাহের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন পিচ্চি রাজা—এমন অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগস্টের পর ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বুনিয়া সোহেলসহ কয়েকটি গ্রুপের সঙ্গে তার বিরোধ বাড়তে থাকে। মাদকের স্পট নিয়ন্ত্রণ, লাইনম্যান নিয়োগ, অর্থ আদায় ও এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বিরোধের ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্টের পর ক্যাম্পে অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্যে পিচ্চি রাজা নিজেও দাবি করেছেন, ৫ আগস্টের পর ক্যাম্পের বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু করে। সেখান থেকেই ধারাবাহিক সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত বলে তিনি উল্লেখ করেন।ক্যাম্পের সাম্প্রতিক সংঘর্ষের প্রসঙ্গে বুনিয়া সোহেলের নামও তার বক্তব্যে উঠে এসেছে। পিচ্চি রাজার ভাষ্য অনুযায়ী, বুনিয়া সোহেল ক্যাম্পে নিজের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তবে এসব হত্যাকাণ্ডে কারা তাকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন—সে বিষয়ে সরাসরি কোনো উত্তর দেননি তিনি।স্থানীয়দের দাবি, বুনিয়া সোহেলের ওপর হামলা ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের পর ক্যাম্পের মাদক কারবারে পিচ্চি রাজার প্রভাব আবারও বাড়ে। গত বছরের অক্টোবরে বুনিয়া সোহেলের আস্তানায় হামলা ও লুটপাটের সময় পিচ্চি রাজাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে প্রভাব বিস্তারের কথা বলতে শোনা যায় বলেও স্থানীয়দের দাবি।পিচ্চি রাজার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা থেকে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, মাদক ব্যবসা থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ পারিবারিক ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক কাজে বিনিয়োগ করা হয়েছে। তার শ্বশুর খোরশেদ, শালা নয়ন ও ফুফাতো ভাই রনিসহ কয়েকজন আত্মীয় অর্থ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত বলে দাবি স্থানীয়দের।তাদের আরও দাবি, ওই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পিচ্চি রাজার ২৫ থেকে ৩০টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও সম্পত্তি রয়েছে।পিচ্চি রাজার সঙ্গে মাদক কারবার ও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে আদি, নবাব, শাহজাদা, ফাইজান, বেলুন, রুবেল, রনি, নাটা সুমন, সুজন, ব্যাটারি কামরান, হীরা ও মঈন পিচ্চিসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, মাদক সরবরাহ, অর্থ আদায়, দখল প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর মতো কাজে তারা যুক্ত।স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু অপরাধী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স পরিচয়কে পরবর্তী সময়ে নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রভাব বিস্তারের কাজে ব্যবহার করে। ফলে একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরও তার জায়গায় নতুন অপরাধী গড়ে ওঠে।তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান বলেন, কে পুলিশের সোর্স আর কে নয়, সেটি তাদের কাছে প্রধান বিষয় নয়। কেউ অপরাধে জড়িত কি না, সেটিই তাদের বিবেচনার বিষয়। তিনি জানান, জেনেভা ক্যাম্পের অপরাধীদের গ্রেফতারে নিয়মিত অভিযান চলছে এবং পিচ্চি রাজাকেও গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।প্রিজন ভ্যান থেকে পালানোর ঘটনায় গাজীপুরের কোনাবাড়ী থানায় মামলা হয়েছে। ঘটনার দুই দিন পরও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইফতেখার হোসেন জানান, থানার উপপরিদর্শক বিশ্বজিৎ মজুমদার বাদী হয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে মামলাটি করেন। মামলায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে পিচ্চি রাজাকে। তাকে গ্রেফতারে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।
প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম