প্রিন্ট এর তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সৈয়দপুরে টিসিবির নীতিমালা লঙ্ঘন, ট্যাগ অফিসারের অনুপস্থিতিতেই চলছে বিক্রয় কার্যক্রম
শাহজাহান আলী, নীলফামারী প্রতিনিধি ||
নীলফামারীর সৈয়দপুরে খোলা বাজারে স্বল্প দামে নিত্য প্রয়োজনীয় পন্য বিক্রির সরকারি কার্যক্রম টিসিবি এর ডিলাররা নীতিমালা লঙ্ঘন করছেন। একইসাথে ওজনে কম দেওয়াসহ কার্ড ছাড়াও অনেককে প্যাকেজ পন্য দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এব্যাপারে প্রশাসন নির্বিকার থাকায় সুবিধাভোগী ভোক্তাদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে সংবাদ কর্মীরা গত শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়নের কুটিরঘাট ব্রীজ সংলগ্ন এলাকায় পন্য বিতরণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে। এসময় দেখা যায়, মেসার্স চওড়া ট্রেডার্স এর বিক্রিকৃত ৪৩৫ টাকা প্যাকেজে ২ কেজি মুশুর ডাল, ১ কেজি চিনি, ২ লিটার সয়াবিন তেল ও একটা গোসলের সাবান দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রশাসনের নিযুক্ত কর্মকর্তা (ট্যাগ অফিসার) নাই। সন্ধ্যায় বিতরণ শেষ পর্যন্ত তার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। প্যাকেজ ক্রয়কারী কয়েকজনের পন্যগুলো পাশের দোকানে সংবাদ কর্মী ও স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে ওজন করে দেখা যায় চিনি ১০ থেকে ২০ গ্রাম কম আর মুশুর ডাল ১০০ থেকে ১২০ গ্রাম করে কম। এর মধ্যে ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের আলেফ উদ্দিনের ছেলে মো: নজু আলী বলেন, সব সময়ই ওজনে কম দেওয়া হয়। অভিযোগ করার পরও কোন প্রতিকার নাই। আজও মেপে দেখেছি মশুর ডাল ১২০ গ্রাম কম দিয়েছে। তেল ও চিনিও কম আছে এবং মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। গত শীতে পাম ওয়েল দিয়েছে। একই ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের ছকি মামুদের ছেলে মো: নাজিমুদ্দিন বলেন, কম দেওয়ার কথা বললে ডিলার গরম (রাগ) দেখায় এবং পরবর্তীতে নানাভাবে হয়রানি করে। আমাদের টাকা দিয়ে কেনা জিনিস তারা চুরি করে আমাদেরকে কম দেয়। আবার যাদের কার্ড নাই তাদেরকেও বিনা টাকায় মাল দেয়। এসময় তিনি একজন স্কুল শিক্ষককে দেখিয়ে দিয়ে বলেন এই লোক কার্ড ছাড়াই প্যাকেজ নিয়ে এলেন। বিনা কার্ডে টিসিবির প্যাকেজ নেওয়া সেই শিক্ষক (ছদ্মনাম রবিউল) স্বীকার করে বলেন, যে ডিলারই হোক আমি কার্ড ছাড়াই পন্য পাই। আমার মত অনেকেই নেয়। চেয়ারম্যান মেম্বার ও গন্যমান্য ব্যক্তিরা এভাবেই এই সুবিধা ভোগ করেন। আর পন্য ওজনে কম দেওয়াটা স্বাভাবিক। নয়তো আমাদেরকে কিভাবে দিবে? ডিলারদের এটুকু করতেই হয়।এদিকে ৫ নং ওয়ার্ডের মাসুম আলীর ছেলে মো. মালেক বলেন, আগে কোম্পানির প্যাকেট করা ডাল ও চিনি দেওয়া হলেও এখন স্থানীয়ভাবে পলিব্যাগে প্যাকেট করে দেওয়া হচ্ছে। তাতে সরকারের দেওয়া ভালো মানের পন্যের জায়গায় লোকালভাবে কেনা মাল দিচ্ছে ডিলাররা। এতে সঠিক মাল পাচ্ছিনা আমরা। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন তদারকি নাই। এমনকি প্রশাসনের নিয়োগকৃত কর্মকর্তা (ট্যাগ অফিসার) এর অনুপস্থিতিতেই বিক্রি কার্যক্রম চলছে। ফলে ডিলারদের চুরি, অনিয়ম, দূর্নীতিও ধরা পড়ছেনা। আনজুম নামে এক সুবিধাভোগী বলেন, জানি ওজনে কম দেয়। প্রতিবারই মাপ করে দেখেছি। কিন্তু কি করবো। কিছু বলতে গেলে যদি কার্ড বাতিল করে দেয় বা কোন কারণে মাল না দেয় তখন কি হবে? আমরা গরীব মানুষ, এটুকু সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলে খুব সমস্যা হয়ে যাবে। তাছাড়া যাদের দেখার দায়িত্ব সেই চেয়ারম্যান মেম্বার ও সরকারি কর্মকর্তারাওতো জানার পরও কিছু করেনা। তাই আমরাও চুপ করে থাকি। এসব অভিযোগের বিষয়ে ডিলার পয়েন্টে দায়িত্বরত মেসার্স চওড়া ট্রেডার্স এর স্বত্বাধিকারী মো. লুৎফর রহমানের ছেলে লিখন বলেন, ট্যাগ অফিসারকে জানানো হয়নি তাই তিনি আসেননি। তাছাড়া প্রয়োজন হয়না। এভাবেই তো আমরা বিতরণ করি। আর ওজন কম দেওয়া হয়না। পলিব্যাগ ছিঁড়ে ও ফেটে পড়ে যাওয়ায় মাঝে মধ্যে দুই একজনের ক্ষেত্রে কম হতেই পারে। আপনারা হয়তো বেছে বেছে সেই কম পাওয়া লোকগুলোর কাছেই গেছেন। এজন্য এমন অভিযোগ পেয়েছেন। উপস্থিত ডাল ও চিনির প্যাকেট মাপতে চাইলে তার কাছে কোন পাল্লা নাই বলে এড়িয়ে যান। একইভাবে ট্যাগ অফিসারের উপস্থিতি ছাড়াই পন্য বিক্রি করতে দেখা গেছে উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে। এখানেও ওজন কম দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এবিষয়ে মেসার্স ইমতিয়াজ ট্রেডার্স এর পক্ষে টিসিবির পন্য বিক্রিকারীরা বলেন, চারদিন হলো এখানে বিক্রি কার্যক্রম চলছে। শুধু প্রথম দিন ট্যাগ অফিসার এসেছিলেন। আর প্রয়োজন নাই, তাই তাকে ডাকা হয়নি। এভাবেই আমরা কাজ করি। কম দেওয়ার অভিযোগ ঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সৈয়দপুর উপজেলায় টিসিবির কার্ডধারী উপকারভোগী হলো মোট ২২৬৭৭ জন। এর মধ্যে স্মার্ট কার্ডধারী- ২১৪৩৪ (বর্তমান) জন। আর এর বিপরীতে ডিলার ৮ জন। এর মধ্যে ৫ টি ইউনিয়নে ৬ জন ও পৌরসভার ১৫ টি ওয়ার্ডের জন্য ২ জন। ডিলার প্রতিষ্ঠানগুলো হলো যথাক্রমে বোতলাগাড়ী ইউনিয়নে মেসার্স দুই বোন এন্টারপ্রাইজ ও সাফা স্টোর, কামারপুকুর ইউনিয়নে মেসার্স ইমতিয়াজ ট্রেডার্স, বাঙালীপুর ইউনিয়নে মেসার্স আনোয়ার ট্রেডিং, খাতামধুপুর ইউনিয়নে আনোয়ার স্টোর, কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়নে মেসার্স চওড়া বাজার এবং পৌরসভায় মেহেরুন ট্রেডার্স ও আফিয়া আসফিয়া ভ্যারাইটিজ। এই ডিলারদের মাঝে মধ্যে পয়েন্ট পরিবর্তন করে অন্য ইউনিয়নে বিক্রির জন্য নিযুক্ত করা হয়। তারা প্রতিমাসে একবার করে নিত্য প্রয়োজনীয় পন্য বিক্রি করেন। এই বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রধান শর্তই হলো ট্যাগ অফিসারের উপস্থিতি। কিন্তু তা করা হয় না।আর এই সুযোগেই চলছে ডিলারদের চুরি। কম দেওয়াসহ নানা অনিয়ম দূর্নীতি। এমনকি একজনই একাধিক ডিলারের লাইসেন্সে পন্য উত্তোলন ও বিক্রি করছেন। প্রশাসন এসব বিষয়ে একেবারে নির্বিকার। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে সমঝোতা করেই এমন বেআইনিভাবে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এব্যাপারে সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাহ ফাতেহা তাকমিলার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, এধরনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ডিলারকে নোটিশ করা হবে এবং অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হবে। সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর ডিলারশীপ পরিচালনায় অনিয়ম পাওয়া গেলে ডিলারশীপ বাতিল করা হবে।
প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম