প্রিন্ট এর তারিখ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রংপুরের চাঞ্চল্যকর চার খুন: মাদকের ধোঁয়া তুলে আসল খুনিকে বাঁচানোর চেষ্টা?
মোঃ রওকত আলী , উপজেলা প্রতিনিধি ||
রংপুরের চাঞ্চল্যকর গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্যের নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিছক কোনো মাদকাসক্তির জেরে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় সাজানো একটি সুপরিকল্পিত মিশন। সম্প্রতি এই ট্র্যাজেডি নিয়ে অনুসন্ধানী তথ্য সামনে আসার পর পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও জবানবন্দির বয়ান নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।ঘটনার পরপরই রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তৎকালীন কমিশনার মো. আব্দুল মাবুদ সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নামের দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করে দাবি করেছিলেন যে, মাদক সেবনের ঝোঁকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। তবে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান এবং বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পুলিশের এই তত্ত্বের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। হত্যাকাণ্ডের রাতে ইয়াবা সেবনের স্থান, অভিযুক্তদের যাতায়াত এবং স্থানীয় এক তরুণের মায়ের বয়ানের সঙ্গে মামলার মূল এজাহারের বিস্তর ফারাক রয়েছে। বিশেষ করে, বাসার ছাদে মাদক সেবনের উপযুক্ত পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও কেন ঘাতকেরা কোনো শব্দ না করে একে একে চারজনকে হত্যা করল এবং আশপাশের কেউ টেরও পেল না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি।প্রযুক্তিগত তথ্যেও পুলিশের দাবির সঙ্গে অমিল পাওয়া গেছে। ২১ আগস্ট রাত ৩টা থেকে পরের দিন দুপুর পর্যন্ত নিহত গণপতি চক্রবর্তী এবং অভিযুক্তদের মোবাইল ফোনের লোকেশন একই মোবাইল টাওয়ারের আওতাধীন থাকলেও তারা একই স্থানে উপস্থিত ছিলেন না।এদিকে হত্যাকাণ্ডের পেছনে আর্থিক লাভের উদ্দেশ্য থাকার যে গুঞ্জন ছড়ানো হয়েছিল, তাও ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। কাচারী বাজার সোনালী ব্যাংক শাখায় গণপতি স্যারের প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৫ লাখ টাকা জমানো থাকার কথা বলা হলেও ব্যাংক নথিপত্র বলছে, ওই অ্যাকাউন্ট থেকে একটি টাকাও তোলা হয়নি। এছাড়া তিনি পিআরএল বা এলপিআরে থাকায় পেনশনের টাকা তোলারও কোনো সুযোগ ছিল না। ফলে আর্থিক স্বার্থে এই খুন—এমন ধারণাও জোরালো নয়।তদন্তে আরও বেশ কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজে কোনো সন্দেহজনক মোটরসাইকেলের যাতায়াত না থাকলেও, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ মূল পোল থেকে যেভাবে কেটে দেওয়া হয়েছিল তা নিয়ে নেসকো বা পুলিশ কেউই কোনো তদন্ত করেনি। সেদিন নির্দিষ্ট ফিדারে মাত্র ১ ঘণ্টা ১৩ মিনিট লোডশেডিং থাকলেও ওই বাড়িটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টি বড় কোনো নাশকতার ইঙ্গিত দেয়।পরিবার ও ঘনিষ্টজনদের মতে, মৃত্যুর আগে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। তাঁর বন্ধু প্রদীপ ও শ্যালিকার ভাষ্যমতে, জীবনের শেষ দেড় মাস তিনি ঘর তালাবন্ধ করে ঘুমাতে শুরু করেছিলেন এবং বিভিন্ন সময় নিজের জীবননাশের আশঙ্কা প্রকাশ করতেন। এছাড়া কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থী নিহত আগামী চক্রবর্তী মৃত্যুর আগে এক বন্ধুর সঙ্গে চ্যাটে সরকারি চাকরির এক প্রার্থীর বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছিলেন।নিহতদের ব্যবহৃত শেষ ফোনের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শেষ ইনকামিং কলটি এসেছিল ২০ আগস্ট বিকেলে তাঁর স্ত্রীর মোবাইল থেকে, যা ২১ আগস্ট ভোর ৬টা ৫ মিনিটে চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, ওই সময়ের মধ্যেই ঘাতকেরা তাদের চূড়ান্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে।
ঘটনার বহু দিন পর রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তীও স্বীকার করেছেন যে, গ্রেপ্তারকৃতরা জবানবন্দিতে মাদক সেবনের নাটক সাজিয়ে তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। পুলিশ প্রশাসনের এমন তাড়াহুড়ো ও দায়সারা তদন্তের পর পরিবারটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত মাস্টারমাইন্ডকে খুঁজে বের করতে এখন নিরপেক্ষ ও পুনর্নিরীক্ষণমূলক একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জোরালো দাবি উঠেছে।
প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম