আমাদের চারপাশের কোনো বন্ধু, আত্মীয় বা প্রিয়জন যখন তাদের কোনো আপনজনকে হারান, তখন তাদের শোকে কাতর হতে দেখে আমরা অনেকেই বুঝতে পারি না ঠিক কী বলা উচিত। আমাদের উদ্দেশ্য থাকে তাদের সান্ত্বনা দেওয়া, কিন্তু অনেক সময় অসতর্কতাবশত বলা কিছু কথা উপকারের চেয়ে উল্টো মানসিক কষ্ট বাড়িয়ে দেয়।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শোক অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া এবং একে হুট করে সহজ করে ফেলার কোনো সংক্ষিপ্ত পথ বা ‘শর্টকাট’ নেই। কোনো প্রিয়জন হারানো ব্যক্তিকে সান্ত্বনা দেওয়ার সময় নিচের ৭টি কথা বলা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা:
১. ‘সবকিছুই কোনো না কোনো কারণে ঘটে’
এই কথাটি শোকাতুর ব্যক্তির কষ্টকে এক প্রকার খাটো করে ফেলে। কারণ, সব শোকের পেছনে কোনো যৌক্তিক বা সান্ত্বনাদায়ক ব্যাখ্যা থাকে না। কোনো কারণ বা যুক্তিই প্রিয়জনকে হারানোর শূন্যতা পূরণ করতে পারে না।
২. ‘আমি ঠিক জানি আপনার কেমন লাগছে’
শোক একটি অত্যন্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি এবং প্রত্যেকের মানসিক ধারণক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা আলাদা। এমনকি আপনি নিজে অতীতে কাউকে হারিয়ে থাকলেও, অন্যের শোকের তীব্রতার সাথে নিজের অভিজ্ঞতাকে তুলনা করা ঠিক নয়।
৩. ‘অন্তত আপনি মানসিকভাবে প্রস্তুতির সময় পেয়েছিলেন’
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর কেউ মারা গেলে অনেকেই এই কথাটি বলে থাকেন। কিন্তু প্রিয়জন চলে যাবেন—এটা আগে থেকে জানলেও, বাস্তব চলে যাওয়ার মূহূর্তের কষ্ট বা শূন্যতাবোধ বিন্দুমাত্র কমে না।
৪. ‘অন্তত আপনার অন্য সন্তান বা পরিবারের সদস্যরা তো আছে’
এ ধরনের কথা বলার মাধ্যমে অবচেতনভাবেই বোঝানো হয় যে, একজনের অভাব অন্যজনকে দিয়ে পূরণ করা সম্ভব। এটি মৃত ব্যক্তির নিজস্ব গুরুত্ব ও স্থানকে চরমভাবে খাটো করে দেখায়।
৫. ‘শক্ত হোন/কান্নাকাটি করবেন না’
এই কথাটি শোকাতুর ব্যক্তির ওপর নিজের আবেগ চেপে রাখার জন্য এক ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। প্রিয়জন হারানোর পর ভেঙে পড়া, কাঁদা বা আবেগ প্রকাশ করাটাই স্বাভাবিক এবং মানসিক হালকা হওয়ার জন্য এটাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
৬. ‘এখন সব ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে হবে’
শোক কাটানোর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা ক্যালেন্ডার নেই। কাউকে জোর করে ভুলিয়ে দেওয়া বা অতীতকে আড়াল করার নাম শোক কাটিয়ে ওঠা নয়। শোককে জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নিতে একেকজনের একেক রকম সময়ের প্রয়োজন হয়।
৭. ‘শুধু ভালো স্মৃতিগুলোর কথা ভাবুন’
শোকের একদম শুরুর দিনগুলোতে ভালো স্মৃতিগুলোও অনেক সময় কষ্টের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ সেই স্মৃতিগুলো মানুষটির অনুপস্থিতিকে আরও বেশি প্রকট করে তোলে। তাই শোকাতুর ব্যক্তি কীভাবে তার দুঃখ প্রকাশ করবেন, তা অন্য কারও নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত নয়।
যেভাবে সঠিকভাবে পাশে দাঁড়াবেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় বড় বড় সান্ত্বনার কথার চেয়ে আপনার নীরব উপস্থিতিই সবচেয়ে বড় সমর্থন হতে পারে। আপনি বলতে পারেন—“আমি জানি না এই মুহূর্তে কী বলা উচিত, তবে আমি তোমার পাশে আছি।”
এছাড়া শুধু মুখে সান্ত্বনা না দিয়ে বাস্তবসম্মত উপায়ে পাশে দাঁড়ানো যায়। যেমন—তার ঘরের কাজে সাহায্য করা, রান্নার দায়িত্ব নেওয়া বা নিয়মিত খোঁজখবর রাখা। মনে রাখবেন, আপনার লক্ষ্য হওয়া উচিত তাকে এটা বোঝানো যে—এই কঠিন ও দীর্ঘ যাত্রায় তিনি একা নন।

