বরিশালের বাকেরগঞ্জে আওয়ামী লীগ ছাড় দিতে নারাজ, বিএনপিতে কোন্দল

মোঃ  জাহিদুল ইসলাম,  ( বাকেরগঞ্জ)  বরিশালঃ
প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ঘেরা বরিশালের সবচেয়ে বড় উপজেলা বাকেরগঞ্জ। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বরিশাল জেলার পূর্ব নাম ছিল বাকেরগঞ্জ।
জেলার সবচেয়ে বড় এ উপজেলা নিয়েই জাতীয় সংসদের বরিশাল-৬ আসন। বিগত ১৫ বছর ধরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় জয়কার বলে দেয় এ আসনে দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি কতটা মজবুত। তারপরেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটের প্রশ্নে টানা তিনটি মেয়াদে আওয়ামী লীগ এ আসনটি ছেড়ে দিয়েছে জাতীয় পার্টির কাছে। তবে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে এবার ছাড় দিতে নারাজ স্থানীয় আওয়ামী লীগ। জোটের হিসেবে এগিয়ে রয়েছে জাতীয় পার্টি।
বিএনপির একাধিক প্রার্থী কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ থাকায় দলটিতে কোন্দল-বিভেদ প্রায় স্পষ্ট।  বর্তমানে বরিশাল-৬ আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে রয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য নাসরিন জাহান রতনা আমিন। এর আগে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট থেকে মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির তৎকালীন মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জোটবদ্ধভাবে হলে এবারও এ আসনে মনোনয়ন চাইবেন বর্তমান এমপি নাসরিন জাহান রতনা আমিন। এমনকি জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচন করলেও তিনি এ আসনের প্রার্থী হবেন বলে জানিয়েছেন। এ আসনে বর্তমানে ২ লাখ ৭৪ হাজার ৮৫১ জন ভোটার রয়েছে। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৩৯ হাজার ৫৫৪ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৩৫ হাজার ২৯৫ জন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটের প্রশ্নে টানা তিনটি মেয়াদে আওয়ামী লীগ এ আসনটি ছেড়ে দিয়েছে জাতীয় পার্টির কাছে।
 খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৬ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মেজর জেনারেল (অব) আব্দুল হাফিজ মল্লিক, যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান বাদশা, বাকেরগঞ্জের উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সামসুল আলম চুন্নু, সাধারণ সম্পাদক ও তিনবারের পৌর মেয়র লোকমান হোসেন ডাকুয়া, সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত মাসুদ রেজার স্ত্রী আইরীন রেজা এবং বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার এসএম মঞ্জুরুল হক মঞ্জু।
সূত্রমতে, নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল মেজর জেনারেল (অব) আব্দুল হাফিজ মল্লিককে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জোটের কারণে আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয় এরশাদের জাতীয় পার্টিকে।
 তাই দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে এ আসনে মেজর জেনারেল (অব) আব্দুল হাফিজ মল্লিককেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতারা।
তবে মাঠপর্যায়ে সবচেয়ে ভালো ও সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন পৌর মেয়র লোকমান হোসেন ডাকুয়া। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী মেজর জেনারেল (অব) আব্দুল হাফিজ মল্লিক সাংবাদিকদের বলেন, ভোটের মাঠের কথা বলা হলে আওয়ামী লীগ এখানে কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই।
 মনোনয়ন প্রত্যাশী বাকেরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও টানা তিনবারের নির্বাচিত পৌর মেয়র লোকমান হোসেন ডাকুয়া বলেন, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে বাকেরগঞ্জের আওয়ামী লীগ সু-সংগঠিত।
 বাকেরগঞ্জে আওয়ামী লীগের কোনো অভ্যন্তরীণ বিরোধ নেই।
এদিকে বরিশাল-৬ আসনে বিএনপির মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ বিরোধ। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন বেশ কয়েকজন। তারা কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। বিএনপি দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হোসেন খান, জেলা বিএনপির সাবেক সম্পাদক নজরুল ইসলাম খান রাজন, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ডা. শহীদ হাছান, কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-সভাপতি নুরুল ইসলাম খান মাসুদ, বিএনপি নেতা শিকদার খলিলুর রহমান, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শহীদ হাসান, জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য আব্দুস শুক্কুর বাচ্চু নেগাবান ও বাকেরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হারুন-অর রশিদ সিকদার।
বিএনপি দলীয় সূত্রে জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৬ আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়নের চিঠি দেওয়া হয়েছিল সাবেক এমপি আবুল হোসেন খান ও আব্দুর রশিদ খানকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রার্থী হয়েছেন আবুল হোসেন খান।
নির্বাচনে মহাজোট মনোনীত জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকের প্রার্থী নাসরিন জাহান রতনা আমিন ১ লাখ ৫৯ হাজার ৩৯৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী নূরুল ইসলাম-আল-আমিন পেয়েছেন ১৪ হাজার ৮৪৫ ভোট এবং বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবুল হোসেন খান পেয়েছিলেন ১৩ হাজার ৬৫৮ ভোট। অতিসম্প্রতি আবুল হোসেন খান বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন।
বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী সাবেক এমপি আবুল হোসেন খান বলেন, বর্তমানে বাকেরগঞ্জে বিএনপিতে কোনো কোন্দল নেই। যেটুকু ঝামেলা ছিল তা মিটিয়ে ফেলা হয়েছে। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি আরও বলেন, নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ের আন্দোলন ও নির্বাচন দুটোর জন্যই বিএনপি এখন পুরোপুরি প্রস্তুত। ইতোমধ্যে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজও এগিয়ে রাখা হয়েছে। সবশেষ বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তাহলে আমি মনোনয়ন পেয়ে হারানো আসনটি পুনরুদ্ধার করব।
এছাড়াও এ আসনে নির্বাচন করার কথা রয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মো. মোহসীন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী নূরুল ইসলাম-আল-আমিনের।
 এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম ছাত্রনেতা মোহাম্মদ মোহসিন বলেন, দীর্ঘবছর থেকে আমি এলাকায় সামাজিক সাংস্কৃতিক নানা কর্মকান্ডে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে আসছি। বরিশাল-৬ আসনের অতীত নির্বাচনের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে,  ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ইউনুস খান।  পরবর্তীতে অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ইউনুস খানের মৃত্যুর পর ১৯৯৪ সালের উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিএনপির তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আব্দুর রশিদ খান।
এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) এম আনোয়ার চৌধুরী বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে বিজয়ী হলেও একইবছরের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীকে হটিয়ে আসনটি দখল করেন আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী সৈয়দ মাসুদ রেজা।
 ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত সৈয়দ মাসুদ রেজা নৌকা প্রতীক নিয়ে পেয়েছিলেন ৪১ হাজার ৮৬৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বিএনপি মনোনীত আব্দুর রশিদ খান ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছিলেন ৩৪ হাজার ৩৮ ভোট।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পান জাসদ থেকে বিএনপিতে যোগদান করা আবুল হোসেন খান। তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ৫৪ হাজার ৩১৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সৈয়দ মাসুদ রেজা নৌকা প্রতীক নিয়ে পেয়েছিলেন ৪১ হাজার ১৭১ ভোট।
পরবর্তীতে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির রুহুল আমিন হাওলাদার লাঙল প্রতীক নিয়ে ৮৯ হাজার ২৩৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বিএনপি মনোনীত আবুল হোসেন খান ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছিলেন ৫৪ হাজার ৫ ভোট।
 এরপর ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য নাসরিন জাহান রতনা আমিন লাঙল প্রতীক নিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বরিশাল-৬ আসন থেকে মহাজোট মনোনীত জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকের প্রার্থী নাসরিন জাহান রতনা আমিন নির্বাচিত হয়েছেন।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

বিষয়: * আওয়ামী লীগ * বিএনপি