বাবা মায়ের সাথে প্রতারণা। সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর তাদের ঠাই হলো পরিত্যক্ত টিনের ছাপড়ার নীচে

 

কামরুজ্জামান শিমুল বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধিঃ

কৌশলে সকল সম্পত্তি লিখে নিয়ে খোঁজ রাখছেনা বয়স্ক ও অসুস্থ বাবা মা’র। ছেলেও পুত্রবধূর এমন প্রতারণার কাছে হেরে তারা এখন বাকরুদ্ধ। খেতে পরতে দেয় না, চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে দেখতে যায় না, স্থানীয়রা কিংবা আত্মীয়-স্বজনের কেউ বাড়িতে গেলে অকারনে ঝগড়া করে পুত্রবধু শাহীনা বেগম। শেষ বয়সে ঠাই হয়েছে রান্না ঘরের পাশে পরিত্যক্ত টিনের ছাপড়ার নীচে। ঘটনাটি ঘটেছে বাগেরহাট জেলা সদরের পূর্ব সায়েড়া গ্রামে। প্রতারণার শিকার ওই গ্রামের মৃত নাজির আলী ফকিরের ছেলে অসুস্থ বৃদ্ধ ফকির মোবারক আলী (৮০) এবং তার স্ত্রী জয়তুন নেছা বেগম (৭০)। প্রতারণা করে সম্পত্তি লিখে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি মানতে নারাজ আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয়রা। বয়স্ক দম্পতির সকল সম্পত্তির দলিল বাতিলের জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানান তারা।

 

স্থানীয়রা জানান, মোবারক ও জয়তুননেছা দম্পতির একমাত্র ছেলে জাকির ও পুত্রবধূ শাহীনা বেগম গত ২০১৬ সালের ১ অক্টোবর হেবা দলিলের মাধ্যমে বিলান ও বাস্তভিটা সহ ২ একর ৬০ শতক জমি রেজিস্ট্রি করিয়া নেয়। সেই থেকে আর খোঁজ রাখে না তাদের। ছেলেও পুত্রবধূ তাদের সাথে প্রতারণা করেছে বিষয়টি টের পেয়ে বাগেরহাট সদর মডেল থানায় ছেলেও পুত্রবধূর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানায় বৃদ্ধ দম্পতি। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা স্থানীয় প্রতিনিধি সহ সকলের উপস্থিতিতে মৌখিকভাবে বিষয়টি মীমাংসা করে দেয়। শর্তানুযায়ী দলিলের মাধ্যমে সকল সম্পত্তি পিতা-মাতার নামে ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। অত্যন্ত চালাক ও প্রতারক জাকির ফকির সালিশ মেনে স্ত্রীকে নিয়ে বাড়িতে চলে আসে। কিন্তু সালিশের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে আজ পর্যন্ত সম্পত্তি ফেরত দেয়নি। উল্টো বাবা মা যাতে জমিতে যেতে না পারে সে লক্ষ্যে আদালতের মাধ্যমে একটি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। বয়স্ক পিতার শরীরে ডায়াবেটিস সহ বিভিন্ন রোগে বাসা বেধেছে। সেমি পাকা ঘর থাকতেও তাকে বসবাস করতে হচ্ছে রান্না ঘরের পাশে পরিত্যক্ত একটি টিনের ছাপড়ার নীচে । খেয়ে না খেয়ে দিন কাটায় তারা। মূলত জমি রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার পর থেকেই দুর্ভোগ নেমে আসে এই বয়স্ক দম্পতির উপর। তবে বয়স্ক দম্পতিও হেবা দলিলটি বাতিলের জন্য আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছে বলে জানান তারা।

 

মোস্তাক শেখ, হাসমত আলী শেখ, কায়েল শেখসহ অনেকে দৈনিক সংবাদ সারাবেলা কে বলেন, বাবা মা’র কাছ থেকে প্রতারণা করে ছেলে জাকিরের ওই জমি নেওয়া ঠিক হয়নি। পুত্র জাকির জমির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এই বৃদ্ধ বয়সে তারা যাবে কোথায়, খাবে কি? জাকির ও তার বউ কখনো বৃদ্ধ ও অসুস্থ দম্পতির খোঁজ রাখে না, খেতে পরতে দেয় না। তাদেরকে ঘর থেকে নামিয়ে দিয়েছে। উল্টো তাদের সাথে সারাক্ষণ খারাপ ব্যবহার করে। এখন তারা খুব অসহায়। যে কোনোভাবে দলিল বাতিল করে সম্পত্তি ফেরত দিলে তারা কিছুটা স্বস্তি পেতো।

 

পুত্রবধু শাহীনা বেগম বলেন, আমার ননদ বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করছে। যতদিন বেঁচে থাকে শ্বশুর-শাশুড়িকে আমরা দেখব। ব্যস্ততার কারণে শশুরকে হাসপাতালে দেখতে যেতে পারি নাই। তাদেরকে ভালো ঘরে থাকতে বললেও তারা এই নোংরা ঘরে থাকে।

 

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তার একমাত্র কন্যা রাজিয়া বেগম বলেন, আমার ভাই কৌশলে বাপের কাছ থেকে সকল সম্পত্তি লিখে নিয়েছে। এখন সে বৃদ্ধ বাপ মায়ের খোঁজ খবর নেয় না। ঘর থেকে তাদের নামিয়ে দিয়েছে। বাপ মা থাকে ভাঙ্গা কুড়ে ঘরে যেখানে মানুষ বসবাস করতে পারে না। বাপ হাসপাতালে ভর্তি ছিল একটি বারের জন্যও তারা দেখতে যায় নাই। আমার বাবা দলিল বাতিলের জন্য আদালতে মামলা করেছে। আমরা আদালতের দিকে চেয়ে বসে আছি।

 

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে জাকির ফকির বলেন, তার বাবা-মা মিথ্যা অভিযোগ করছে। সকল সম্পত্তি ইচ্ছাকৃতভাবেই তাকে তার বাবা লিখে দিয়েছে। বাবা হাসপাতালে ভর্তি এ খবর শুনে আমি ও আমার স্ত্রী হাসপাতালে গেলে যে কোন কারণে তাদের সাথে দেখা হয়নি। ভালো ঘরে থাকতে বললেও তার বাবা থাকে না, তার কাছে এই নোংরা জায়গা পছন্দ। মা- বোন মিলে জমির লোভে সারাক্ষণ বিবাদ সৃষ্টি করছে। ওই জমি নাম জারি হয়ে গেছে। তারা কোনভাবেই আর ফেরত নিতে পারবে না।

 

স্থানীয় ইউপি সদস্য দুলাল মন্ডল বলেন, যে কোনোভাবে জমি জাকিরের নামে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে থানায় সালিশ হয়েছিল কিন্তু জাকির সেই সালিশের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করেছে। আমিও সালিশ করে সিদ্ধান্ত দিয়েছি কিন্তু মানে না। খুবই মানবতের জীবন যাপন করছে ওই বৃদ্ধ দম্পতি। শোনা যাচ্ছে, জাকির ওই সম্পত্তি অন্য কোথাও হ্যান্ডওভার করে দিবে। আসলে এর কোন সমাধান নেই তবে জাকির যদি কিছুটা জমি ওর মায়ের নামেও দিতো। তা দিয়ে হয়তো ওদের চলে যেত। তা না হলে এই দম্পতির ভিক্ষা করে খাওয়া লাগবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাদেরকে সাহায্য করেছি। স্থানীয় চেয়ারম্যান সাহেবকেও বলেছি চেয়ারম্যান সাহেব কিছু টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে এবং একটি কার্ডের ব্যবস্থা করে দিবেও বলেছে।

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
বিষয়: * প্রতারণা * বাগেরহাট
লাইভ রেডিও
সর্বশেষ সংবাদ