দুই মেয়েকে নিয়ে জাপানী নারীকে স্বামীর সঙ্গেই আপাতত থাকার নির্দেশ আদালতের

দুই মেয়েকে নিয়ে জাপানী নারীকে স্বামীর সঙ্গেই আপাতত থাকার নির্দেশ আদালতের

জাপানী মা

 

জাপানি নাগরিক মা নাকানো এরিকো ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক বাবা শরীফ ইমরানকে আপাতত একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত দিয়েছে হাই কোর্ট।

 

দুই শিশু ও তাদের মা-বাবার সঙ্গে কথা বলার পর এ অদেশ দেয় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ভার্চুয়াল হাই কোর্ট বেঞ্চ।

 

ঢাকা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালককে বলা হয়েছে বিষয়টি দেখভাল (মনিটরিং) করতে এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) বলা হয়েছে বাচ্চাসহ সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

 

শরীফ ইমরানের ঠিক করা গুলশানের একটি ফ্ল্যাটে আগামী ১৫ দিন তাদের থাকতে বলা হয়েছে।  

আদালতের আদেশ সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দিতে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমারকে বলা হয়েছে।

 

আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর পরবর্তী আদেশের দিন ধার্য করে আদালত বলেছে, বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণে রাখবে। কোনো পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ উঠলে তা পুনর্বিবেচনা করা হবে।

 

বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক ইনায়েতুর রহিম উভয় পক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, “আপনারাও একটু কো-অপারেট করেন। সবারই মোটিভেশন দরকার। পক্ষ হয়ে গেলে কিন্তু বিষয়টির সমাধান হবে না। আমরা আশা করছি, এটির একটি ভালো সমাধান হবে।”

 

এর আগে সকালে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার থেকে শিশুদের আদালতে হাজির করা হয়। সঙ্গে আসেন মা-বাবা ও শিশুদের ফুপু।

 

কিছুক্ষণ শুনানির পর আদালত খাস কামরায় নিয়ে দুই শিশু ও তার মা-বাবার বক্তব্য শোনে। এরপর আবার শুনানি শুরু হলে দুই শিশু কোথায়, কার সঙ্গে কীভাবে থাকবে, সে বিষয়ে বিকালে আদেশ দেবে বলে জানায় আদালত।

 

এই সময়ের মধ্যে এসব বিষয়ে দুই পক্ষকে সমঝোতায় আসতে বলা হয়।

 

আদালতে নাকানো এরিকোর পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। বাবা শরীফ ইমরানের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ।

 

দুই শিশুর অভিভাবকত্ব চেয়ে জাপানি নাগরিক নাকানো এরিকো রিট আবেদন করলে দুই শিশুকে হাজির করতে গত ১৮ আগস্ট নির্দেশ দিয়েছিল হাই কোর্ট।

 

শিশুদের বাবা শরীফ ইমরান ও তার বোন আমিনা জেবিনকে (শিশুদের ফুপু) ওই নির্দেশ দেওয়া হয়।

 

শরীফ ইমরান যাতে দুই মেয়েকে নিয়ে দেশত্যাগ করতে না পারে, সেজন্য তাদের দেশত্যগে নিষেধাজ্ঞাও দেয় আদালত।

 

এর মধ্যে গত ২২ আগস্ট দুই শিশুকে ইমরানের বারিধারার বাসা থেকে উদ্ধার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তারপর থেকে তারা মহানগর পুলিশের সাপোর্ট সেন্টারে ছিল।

 

সেখান থেকেই মঙ্গলবার দুই শিশুকে আদালতে নিয়ে আসে পুলিশ। এরপর দুই পক্ষের আইনজীবীর শুনানি শুরু হয়।

 

শুনানিতে শিশির মনির বলেন, “বাচ্চাদের মা ঢাকার বাড়িধারায় একটি বাসা ভাড়া করেছেন। আমরা চাই ওই বাসায় বাচ্চারা মায়ের সাথে থাকুক। বাচ্চাদের বাবাও তার মত করে ওই বাসায় আসুক-থাকুক। কারণ, এই কদিনে বাচ্চাদের মধ্যে যে একটা ট্রমা তৈরি হয়েছে, তা কাটুক। তারপর আপনারা এবিষয়ে চূড়ান্ত কোনো আদেশ দেন।”

 

আইনজীবী ফাওজিয়া করিম বলেন, “বাচ্চারা বাবার বাসায় থাকুন। মা বাচ্চাদের দেখতে আসুক, কোনো সমস্যা নেই। মা যে বাসাটার কথা বলছে সে এরিয়ায় বাচ্চাদের থাকার বিষয়ে আমাদের আপত্তি আছে।”

 

তখন বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম বলেন, “আমরা চাই বাচ্চা দুটি পারিবারিক পরিবেশে থাকুক। আপনারা একটু পজিটিভলি ভাবুন।”

 

এরপর ফাওজিয়া করিম বলেন, “আমরা তাহলে দু-পক্ষ একটু বসে সিদ্ধান্ত নিই। তারপর আপনাকে জানাই। আপনি তখন সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।”

 

এরপর বিকালে আদালত সিদ্ধান্ত জানায়।

 

আদালতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ১১ জুলাই জাপানি আইন অনুযায়ী নাকানো এরিকো (৪৬) ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকার নাগরিক শরীফ ইমরান (৫৮) বিয়ে করেন। গত ১৮ জানুয়ারি বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করেন এরিকো।

 

টোকিওতে এক যুগের দাম্পত্য জীবনে তারা তিন মেয়ের বাবা-মা হন। তাদের বয়স যথাক্রমে ১১, ১০ ও ৭ বছর। তিন মেয়ে টোকিওর একটি স্কুলে পড়ে।

 

গত ২১ জানুয়ারি ইমরান টোকিওর ওই স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে তার এক মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার আবেদন করেছিলেন। তবে এরিকোর সম্মতি না থাকায় স্কুল কর্তৃপক্ষ সেই আবেদন নাকচ করে।

 

পরে স্কুলবাসে করে বাড়ি ফেরার পথে বাস স্টপেজ থেকে ইমরান বড় দুই মেয়েকে অন্য একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যান বলে এরিকো জানান।

 

পরে ২৫ জানুয়ারি ইমরান তার আইনজীবীর মাধ্যমে এরিকোর কাছে সন্তানদের পাসপোর্ট হস্তান্তরের আবেদন করলে এরিকো তা প্রত্যাখ্যান করেন।

 

এদিকে গত ২৮ জানুয়ারি সন্তানদের জিম্মা চেয়ে টোকিওর পারিবারিক আদালতে মামলা করেন এরিকো।

 

টোকিওর আদালত আদালত গত ৭, ১১ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি পারিবারিক সাক্ষাতের আদেশ দেয়।

 

তবে এই আদেশ অমান্য করে শরীফ ইমরান শুধু একবার মায়ের সঙ্গে বড় দুই মেয়ের সাক্ষাতের সুযোগ দেন বলে জানান এরিকো।

 

গত ৯ ফেব্রুয়ারি ইমরান মেয়েদের জন্য নতুন পাসপোর্টের আবেদন করেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন পাসপোর্ট গ্রহণ করার পর গত ২১ ফেব্রুয়ারি দুই মেয়েকে নিয়ে দুবাই হয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন ইমরান।

 

এদিকে গত ৩১ মে টোকিওর পারিবারিক আদালত এরিকোর অনুকূলে বড় দুই মেয়ের জিম্মা হস্তান্তরের আদেশ দেয়।

 

রিট আবেদনে এরিকো বলেন, করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে এত দিন বাংলাদেশে আসতে পারেননি তিনি। গত ১৮ জুলাই শ্রীলঙ্কা হয়ে তিনি বাংলাদেশে আসেন।

 

মেয়েদের দেখা পেতে এরিকো বাংলাদেশে এসে কোভিড-১৯ পরীক্ষা করার পর ফল নেগেটিভ আসে, কিন্তু শরীফ ইমরান তা অবিশ্বাস করেন এবং ২১ জুলাই প্রাভা হেলথকেয়ারে কোভিড টেস্ট করাতে বলেন।

 

প্রাভায় প্রথমে ফল পজিটিভ এসেছিল। পরে জাপান দূতাবাসের সুপারিশে আবার কোভিড পরীক্ষা করালে ফল নেগেটিভ আসে।

 

কিন্তু শরীফ ইমরান তা বিশ্বাস করছিলেন বলে আরও দুই দফায় কোভিড পরীক্ষা করান এরিকো। তাতেও ফল নেগেটিভই আসে। তিনি বাংলাদেশে আসার আগেই ফাইজারের দুই ডোজ টিকা নেন।

 

এরিকো জানান, ইমরান মেয়েদের সঙ্গে দেখা করাতে গত ২৭ জুলাই তাকে চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়েছিল।

 

এতে তার মনে আশঙ্কা হয়, ইমরান মেয়েদের আর কখনও তার সঙ্গে দেখা করতে দেবে না। এই কারণে তিনি রিট আবেদন করেন।

এখন আদালতের নির্দেশ মেনে ১৫ দিন একসাথে থাকার পরেই বোঝা যাবে শিশুদের ভাগ্যে কী ঘটতে চলেছে।

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
বিষয়: * অভিভাবকত্ব * জাপানী মা * দুই কন্যা শিশু