তালিবান নেতা মোল্লা বারাদার কাবুলে

আফগানিস্তানের সাবেক সরকার এবং মার্কিন জোটভুক্ত সামরিক বাহিনীর সাথে বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা লোকজন যখন মরিয়া হয়ে দেশত্যাগের চেষ্টা করছে তখন তালেবানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও উপ-প্রধান মোল্লা আব্দুল গনি বারাদার দেশটিতে নতুন সরকার গঠনের লক্ষ্যে আলাপ আলোচনার জন্য রাজধানী কাবুলে গিয়ে পৌঁছেছেন। গত মঙ্গলবার তিনি দোহা থেকে আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কান্দাহারে ফিরে যান। গতকাল শনিবার তিনি রাজধানী কাবুলে গেছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

বারাদার কাতারের দোহায় তালেবানের রাজনৈতিক অফিসের প্রধান। আন্তর্জাতিক পক্ষের সঙ্গে আলোচনার জন্য এতদিন তিনি সেখানে অবস্থান করছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে নতুন আফগান সরকারে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।

যে চার ব্যক্তি ১৯৯৪ সালে তালেবান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মি. বারাদার তাদের মধ্যে একজন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ২০০১ সালে তালেবান সরকার উৎখাত হওয়ার পর তিনি এই গ্রুপটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন।

তালেবানের এক কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাকে বলেন, আলোচনায় জিহাদি নেতা এবং রাজনীতিবিদদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তালেবান বা ক্ষমতাচ্যুত সরকার কাকে আফগানিস্তানের আনুষ্ঠানিক নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের মধ্যে বিভক্তি রয়েছে। তবে ক্রমশ তালেবানকে স্বীকৃতির পক্ষে জনমত বাড়ছে বলে জানা গেছে। তুরস্ক বলেছে, আফগানিস্তানে তালেবান সরকার গঠন করার পর তাদের স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে আঙ্কারা।

একজন সংবাদদাতা বলেছেন, আফগানিস্তানে এখন সরকার গঠনের কঠিন কাজটি শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, এর আগে কঠোর নিয়মকানুন অনুসারে দেশ পরিচালনার জন্য এই গ্রুপটির ব্যাপক নিন্দা করা হয়েছিল। সেসময় মাত্র তিনটি দেশ তাদেরকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু তালেবান এখন জানে যে তাদেরকে এবার আগের চেয়ে ভিন্ন রকমের হতে হবে। তিনি আরো বলছেন, কান্দাহারে আলাপ আলোচনা শেষ করে মোল্লা বারাদারের কাবুলে আসার পর সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় এখন গতি আসবে। সবার কৌত‚হল এই তালেবানের নেতৃত্বে এবার কী ধরনের সরকার গঠিত হয় তা দেখার জন্য। তালেবান ইতোমধ্যে সকলের অংশগ্রহণে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। রাজনৈতিক নেতা হামিদ কারজাই এবং আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহ এখনও কাবুলে অবস্থান করছেন। আলোচনা করছেন তালেবানের নেতাদের সঙ্গে। তালেবানের আরো একজন নেতা যাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের পক্ষ থেকে আহবান জানানো হয়েছিল, সেই খলিল হাক্কানিকেও রাজধানী কাবুলে দেখা গেছে। তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের অর্থ পুরষ্কার ঘোষণা করেছিল। গত শুক্রবার তাকে দেখা গেছে সশস্ত্র ব্যক্তি পরিবেষ্টিত অবস্থায়। তাকে একটি মসজিদে নামাজিদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখতেও দেখা গেছে।

ক’সপ্তাহেই তালেবান সরকারের রূপরেখা : আফগানিস্তানে নতুন তালেবান সরকারের রূপরেখা কেমন হবে, তা নিয়ে জল্পনা বাড়ছেই। এবার তালেবানের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই সরকারের রূপরেখা দেয়া হবে। শনিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে এই তথ্য জানিয়েছেন তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তালেবানের ওই মুখপাত্র বলেন, এই রূপরেখা দেয়ার জন্য আইন, ধর্ম ও পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। এর আগে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল তালেবান। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর হস্তক্ষেপে তারা ক্ষমতাচ্যুত হয়। ওই সময় শরিয়াহ আইন অনুসারে দেশ পরিচালনা করেছিল তারা। সে সময় নারীশিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। এ ছাড়া নারীর একা বাইরে যাওয়া ও ঘরের বাইরে নারীর কাজ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। সে সময় চুরির অভিযোগ প্রমাণিত হলে অঙ্গচ্ছেদের বিধানও ছিল আফগানিস্তানে। তবে এবার ঠিক কেমন সরকার হবে, তা এখনো জানা যায়নি।

গত ১৫ আগষ্ট কাবুল দখল করে তালেবান। এরপর গত মঙ্গলবার তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তালেবান আফগানিস্তানের মাটি সন্ত্রাসের কার্যকলাপে ব্যবহার করতে দেবে না। নারীদের পড়াশোনা ও কাজের সুযোগ দেয়া হবে। সংবাদমাধ্যমও স্বাধীনতা পাবে। তাদের সরকার পরিচালিত হবে ইসলামি মূল্যবোধে।

তালেবানের পরবর্তী পদক্ষেপ কী?
আফগানিস্তানের প্রধান নির্বাহীর প্রাক্তন সিনিয়র উপদেষ্টা ও ফ্রান্স ও কানাডায় প্রাক্তন আফগান রাষ্ট্রদূত ওমর সামাদ তালেবান শাসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে ডয়েচে ভেলের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনও জানি না যে, তারা বিশুদ্ধভাবে তালেবান স্টাইলে ক্ষমতা সংহত করতে যাচ্ছে, নাকি তারা অংশগ্রহণ করতে পারে এমন অন্যদের জন্য রাজনৈতিক জায়গা খুলে দেবে’।
সামাদ ব্যাখ্যা করেছেন যে, তালেবানরা যে পথ গ্রহণ করে তাতে আন্তর্জাতিক সাহায্যও ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, তালেবানকে ‘অভ্যন্তরীণভাবে এবং বহিঃভাবে আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখাতে হবে’।

৩১ আগস্টের পর সহজ এক্সিট
আগামী ৩১ আগস্টের পর দেশ ছাড়তে ইচ্ছুক আফগানদের বহিগংমন সহজ হবে বলে জানিয়েছে তালেবান। তালেবানরা যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছে যে, এ মাসের শেষের দিকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পরও আফগানদের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ছাড়তে দেওয়া হবে। তবে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস তালেবানদের সাথে আলোচনা করার সময় সতর্কতার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘তাদের কথাগুলো এক জিনিস, একমাত্র বিষয় হল তাদের কাজ’। আফগানিস্তান থেকে সম্পূর্ণ মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের চ‚ড়ান্ত তারিখ হিসেবে আগস্টের শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। রোববার তালেবানরা ব্যাপক আক্রমণ করার পর তালেবানরা রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগেই এটি নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রস্থান ত্বরান্বিত করতে বাধ্য হয়েছে।

১৩ হাজার মানুষকে অপসারণ
এদিকে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য এখনও বহু মানুষ কাবুল বিমানবন্দরে জড়ো হচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জানিয়েছেন যে, তারা এখনও পর্যন্ত ১৩ হাজার লোককে আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। লোকজনের এই পালানোর চেষ্টায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তালেবানের বিরুদ্ধে। বলা হচ্ছে শহরের যে এয়ারপোর্ট রোড ধরে বিমানবন্দরে পৌঁছাতে হয় সেই সড়কে তালেবান কিছু তল্লাশি চৌকি স্থাপন করেছে। সশস্ত্র তালেবান নেতারা বিমানবন্দরের চারপাশে টহল দিচ্ছে বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু তালেবানের একজন নেতা লোকজনকে বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি জানান, যাদের ভ্রমণের জন্য বৈধ কাগজপত্র নেই শুধু তাদেরকেই তারা ফিরিয়ে দিচ্ছেন।

আফগানিস্তান থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টায় সহায়তা করার জন্য গতকাল এক জোড়া জার্মান সামরিক হেলিকপ্টার কাবুলে পৌঁছেছে। জার্মানির সামরিক বাহিনী বুন্দেসওয়েহর জানিয়েছে, হেলিকপ্টারগুলোর আকার অপেক্ষাকৃত ছোট হওয়ায় সেগুলো শহরাঞ্চলে সহজে অবতরণ করতে পারবে এবং শহরের বিমানবন্দরে পৌঁছার চেষ্টা করা কাবুলের লোকদের উদ্ধারে সহায়ক হবে। আন্তর্জাতিক সৈন্যরা বিমানবন্দরটির সুরক্ষায় রয়েছে। তবে তালেবানরা বর্তমানে ঘিরে রেখেছে এবং এর আশেপাশের এলাকায় প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করছে।
বুন্দেসওয়ের মহাপরিদর্শক ইবারহার্ড জর্ন শুক্রবার বার্লিনে বলেন, ‘এটি একটি বাস্তব বিমান চলাচল। এটি একটি ট্যাক্সি পরিষেবা নয়’।

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে তালেবানের বিজয়ের ছয় দিন পর প্রায় ১২ হাজার বিদেশি নাগরিক এবং দূতাবাস ও সাহায্য সংস্থায় কর্মরত আফগানদের দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তা রয়টার্স বার্তা সংস্থাকে বলেন, ‘সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি ধীর, কারণ এটি ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ আমরা বিমানবন্দরের বাইরে তালেবান সদস্য বা বেসামরিক নাগরিকদের সঙ্গে কোনো ধরনের সংঘর্ষ চাই না’।

কর্মকর্তাদের মতে, মিত্র শরণার্থী কর্মসূচির অংশ হিসেবে আফগানিস্তান থেকে প্রায় ৩০০ শরণার্থী জার্মানির রাইনল্যান্ড-প্যালাটিনে অবস্থিত মার্কিন রামস্টেইন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করেছে। রামস্টাইনের সামরিক ঘাঁটিতে তারাই প্রথম এসেছে।
মার্কিন বিমান বাহিনী তাদের দুটি বিমানে কাতার থেকে তাদের উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। শরণার্থীদের প্রথমে বিমানের হ্যাঙ্গারে অস্থায়ী বাসস্থানে রাখা হবে।

হোটেল টু বিমানবন্দর হেলিকপ্টার
কাবুলের হোটেল ব্যারন থেকে শহরের বিমানবন্দরে ২০০ মিটার (৬৫৬ ফুট) আমেরিকানদের উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনটি মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে যে, ১৬৯ মার্কিন নাগরিককে এইভাবে পরিবহন করা হয়েছে। পেন্টাগনের মুখপাত্র জন কিরবি বলেন, আমেরিকানরা বিমানবন্দরের গেটে যেতে পারেনি।
রোববার তালেবানরা রাজধানীতে প্রবেশের পর বিমানবন্দরে হাজার হাজার মানুষের স্রোত দেখা দেয়।

তালেবানের সঙ্গে মিলিয়েছেন আশরাফ গনির ভাই!
তালেবানের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন অপসারিত আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির ভাই! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওর ভিত্তিতে এই জল্পনা শুরু হয়েছে।

ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন আফগান নেতার মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন দাড়িগোঁফ কামানো এক ব্যক্তি। দাবি করা হয়েছে, সাদরে যাকে আপ্যায়ন করা হচ্ছে, তিনিই সাবেক প্রেসিডেন্টের ভাই হাসমত গনি আহমেদজাই। উপস্থিত অন্যান্যদের মধ্যে রয়েছেন তালেবান নেতা খলিল উর রহমান এবং মুফতি মেহমুদ জাকির। মুফতি তালেবানের ধর্মীয় নেতা বলে পরিচিত। এই ভিডিওর সত্যতা অবশ্য যাচাই করে দেখা সম্ভব হয়নি। প্রকাশিত বিভিন্ন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, আশরাফ গনির ভাই হাসমত তালেবান শাসনের দরাজ প্রশংসাও করেছেন।

গত ১৫ আগস্ট কাবুল দখল করে তালেবান। সে দিনই দেশ ছেড়ে পালান আশরাফ গনি। বর্তমানে দুবাইয়ে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। একতরফা তালেবান অভ্যুত্থানের মধ্যেই গত কয়েকদিন ধরে কাবুল থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে পাঞ্জশির এলাকায় তালেবান বিরোধী শক্তি প্রতিরোধ গড়তে শুরু করে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আফগানিস্তানের মোট তিনটি প্রদেশ এখন তালেবান বিরোধীদের দখলে। আরো কিছু প্রদেশে লড়াই চলছে। তালেবান বিরোধী এই অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আহমেদ শাহ মাসুদের পুত্র আহমেদ মাসুদ। সঙ্গে পেয়েছেন গনি সরকারের আমলের ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরুল্লা সালেহ্কে। শোনা যাচ্ছে, গনির আমলের আফগান সেনার একটি অংশের প্রত্যক্ষ সমর্থনও পাচ্ছেন মাসুদরা। এ পরিস্থিতির মধ্যেই সাবেক প্রেসিডেন্টের ভাইয়ের সাথে তালেবানের সখ্যতার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সূত্র : বিবিসি বাংলা, ডয়েছে ভেলে, রয়টার্স রিপাবলিক ওয়াল্ড।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
বিষয়: * আফগানিস্তান * কাবুল * মোল্লা বারাদার